সাফল্যের ৪৫ পেরিয়ে ৪৬ বছরে বেপজা
ঢাকা, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) সাফল্যের ৪৫ বছর পূর্ণ করে আজ ৪৬তম বছরে পদার্পণ করছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এ প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় অনন্য অবদান রেখে আসছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্তে আশির দশকের শুরুতে বেপজার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল খুবই সীমিত। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশেকে রপ্তানীমুখী শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন। এরপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে ১৯৮০ সালে ‘বেপজা আইন’ পাস হয়। এরপর ১৫ এপ্রিল, ১৯৮১ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৮৩ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেশের প্রথম ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী উৎপাদনের বাস্তব প্রয়োগ শুরু হয়। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ইপিজেড কার্যক্রম দেশজুড়ে সম্প্রসারিত হয়। ১৯৯৩ সালে ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার ফলে সাভার-আশুলিয়া অঞ্চল একটি প্রাণবন্ত শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়। এছাড়া আদমজী জুট মিলস ও কর্ণফুলী স্টিল মিলসকে ইপিজেডে রূপান্তরের কৌশলগত সিদ্ধান্ত দেশের শিল্পখাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে- মোংলা, কুমিল্লা, উত্তরা ও ঈশ্বরদীসহ মোট ৮টি ইপিজেড সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
২০১৮ সালে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল’ স্থাপনের কাজ শুরু হয়, যেখান থেকে ইতোমধ্যে পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে।
এই অঞ্চলে ৮টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেছে এবং আরও ৫টি পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছে। এছাড়া ৩৪টি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এ বছরেই পটুয়াখালী ও যশোর ইপিজেডের প্লট বরাদ্দ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বেপজার অধীনে ৮টি ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের মোট আয়তন মাত্র ৩ হাজার ৫৫০.৩৩ একর (১৪.৩৭ বর্গ কিলোমিটার), যা দেশের মোট আয়তনের ০.০০১ শতাংশেরও কম। তবে এই ক্ষুদ্র এলাকা থেকেই দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৫-২০ শতাংশ আসছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে বেপজার অবদান ছিল ১৭.০৩ শতাংশ।
বিগত ৪৫ বছরে বেপজা ৭২৯ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে এবং ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। এসব জোনে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, যার বড় একটি অংশই নারী। এই কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, সামাজিক পরিবর্তন ও নারী ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইপিজেডের প্রতি একর জমি থেকে বছরে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় অর্থনীতিতে বেপজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান ছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা।
বেপজাধীন জোনসমূহে বর্তমানে ৪৫০টি চালু কারখানার মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশ তৈরি পোশাক উৎপাদন করে। বাকি ৬৮ শতাংশে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ক্যামেরা লেন্স, প্রিন্টারের টোনার, বাইসাইকেল, চশমার ফ্রেম, উইগ, জুতা এমনকি কফিনও তৈরি হচ্ছে। বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ড্রোন কারখানা।
২০২৫ সালের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বেপজা দেশি-বিদেশি ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ৩০টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, যেখানে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬৩ কোটি মার্কিন ডলার। এতে প্রায় ৬৪ হাজার বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং সবুজ শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে বেপজা ২০৩০ সালের মধ্যে তার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ সৌর শক্তি থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এছাড়া শ্রমিকদের কল্যাণে প্রতিটি ইপিজেডে হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার রয়েছে যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ঔষধ দেওয়া হয়। এছাড়া, ডে-কেয়ার সেন্টারও স্থাপন করা হয়েছে। শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য রয়েছে ‘বেপজা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ’, যেখানে তারা ৫০ শতাংশ ভর্তুকিতে পড়াশোনার সুযোগ পায়। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইএলও-র সঙ্গে ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম’ চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে বেপজা।
সাফল্যের ৪৫ বছর পেরিয়ে ৪৬তম বছরে পদার্পণ করা বেপজা আজ এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।