২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান সিপিডির
ঢাকা, ১০ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) একটি বিস্তৃত সুপারিশমালা উপস্থাপন করেছে। এতে নবনির্বাচিত সরকারকে একটি বাস্তবসম্মত রাজস্ব কাঠামো গ্রহণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকারের জন্য এটি প্রথম বাজেট হওয়ায় এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’
রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে আজ অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ নিয়ে সিপিডির সুপারিশ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) রাজস্ব কাঠামোয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি দেখা গেছে। এর মধ্যে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির হার মাত্র ১২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ছিল গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন— মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ।
ফলে, আগের বছরের অনেক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আরো সতর্ক ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় প্রচলিত ধারা থেকে বের হয়ে বাস্তবসম্মত রাজস্ব আহরণ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি।
দেশীয় সম্পদ আহরণ বাড়াতে এবং নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর ব্যাপারে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর কার্যকর কর আরোপ এবং দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর কর আরোপ বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরো বলেন, কর প্রণোদনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব অ্যাড-হক ব্যবস্থা ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে বন্ধ করা উচিত।
সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে থাকায়, সরবরাহজনিত দাম বৃদ্ধি মোকাবিলায় তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজস্ব নীতির সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, ‘খাদ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকিগুলো বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দ করা উচিত।’
ফাহমিদা খাতুন বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে সুবিধাভোগীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং কৃষকদের জন্য সমন্বিত সেবা ও ভর্তুকি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ফার্মার স্মার্ট কার্ড চালুর উদ্যোগকে সিপিডি সমর্থন করে।
মজুতদারি ও অপ্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম প্রতিরোধে প্রতিযোগিতা কমিশনকে আরো শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জাপানের সাথে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)-এর মতো বৈদেশিক উন্নয়নের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া, এলডিসি-উত্তর পরিস্থিতির জন্য অর্থনীতিকে প্রস্তুত করতে ডব্লিউটিও’র প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ট্যারিফ সমন্বয় এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ রপ্তানি ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া প্রয়োজন।
গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে আসা বেসরকারি বিনিয়োগকে পুনরুজ্জীবিত করতে তিনি ব্যবসায়িক সেবা ও অনুমোদনের জন্য ‘ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালুর সুপারিশ করেন।
জ্বালানি খাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের জন্য জ্বালানি বিভাগের বাজেট অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এছাড়া, ২০৪১ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্যে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ যন্ত্রাংশের ওপর বর্তমানে সর্বোচ্চ ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত আরোপিত উচ্চ শুল্ক কমানোর সুপারিশ করেন।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষাক্ষেত্রে সমান্তরাল বিভিন্ন ধারাকে মানসম্মত করা এবং উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়াতে সুনির্দিষ্ট উপবৃত্তির ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সরকারের জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব প্রদর্শন এবং টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।