অর্থ মন্ত্রণালয়কে ইআরএফের ২১ দফা প্রাক-বাজেট প্রস্তাব
ঢাকা, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্য হ্রাস এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ২১ দফা প্রাক-বাজেট প্রস্তাব দিয়েছে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)।
আজ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অর্থনৈতিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ প্রস্তাব তুলে ধরেন সংগঠনের প্রেসিডেন্ট দৌলত আকতার মালা।
আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমানসহ অর্থ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়াও আলোচনা সভায় ইআরএফের সহ-সভাপতি আশরাফুল ইসলাম. সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম, অথ সম্পাদক আমিনুল ইসলামসহ সংগঠনের কার্যনির্বাহী পরিষোদের সদস্যসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
বাজেট প্রস্তাবে ইআরএফ বলেছে, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা জরুরি। এলডিসি গ্রাজুয়েশন সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বা সরকারি ব্যয় সংকোচন যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে ইআরএফ বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার, সরবরাহ চেইনে সিন্ডিকেট ভাঙা এবং চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে লাভের সীমা নির্ধারণ করে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ওপেন মার্কেট সেল কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় এসব উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
ইআরএফ উল্লেখ করে, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ও ভর্তুকির চাপে সরকারের পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, অথচ উন্নয়ন ব্যয় কাক্সিক্ষত হারে বাড়ছে না। তাই পরিচালন খাতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ে বরাদ্দ বাড়ানো এবং পুঁজিবাজার শক্তিশালী করে নতুন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে উচ্চমানের হাসপাতাল স্থাপন এবং চিকিৎসা ব্যয় কমানোর সুপারিশ করেছে ইআরএফ। সংগঠনটি জানায়, দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকে নিজ খরচে বহন করতে হয়, যা অনেককে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা ও শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এছাড়া সরকার ঘোষিত বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচির স্পষ্ট রূপরেখা বাজেটে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে ইআরএফ বলেছে, কোন খাতে কী ধরনের সংস্কার হবে এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব কীÑতা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি ও যুগোপযোগী শিক্ষার প্রসার, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং মিড-লেভেল ম্যানেজমেন্টে দক্ষ জনবল তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এলডিসি উত্তরণকে সামনে রেখে বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বাড়ানো, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রাজস্ব নীতিতে পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানি শুল্ক কমানোর কথাও বলা হয়েছে।
এসএমই খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহায়ক আর্থিক ও রাজস্ব নীতি প্রণয়নের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা, ট্রান্সফার প্রাইসিং আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুপারিশ করেছে ইআরএফ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ বন্ধ এবং বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মেধা ও দক্ষতার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ক্লাস্টার সিস্টেম চালু এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মানবসম্পদ উন্নয়নে পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে কর নেট সম্প্রসারণ, প্যাকেজ ভ্যাট পুনর্বহাল, কর ছাড়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ডাটাবেজের সঙ্গে ব্যাংকিং তথ্য সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা উপকরণের কর হার কম রাখা, সঞ্চয়ে উৎসাহ প্রদান এবং কর ফেরত সহজ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাজেট ঘোষণার সময় পরিবর্তন করে দিনের প্রথম ভাগে আনা, নীতির প্রভাব বিশ্লেষণে গবেষণা জোরদার এবং অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ইআরএফ মনে করে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ কমবে এবং অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত হবে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি রোধে এনবিআরের ডাটাবেজ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে একটি ‘গেম-চেঞ্জার’ ভূমিকা পালন করতে পারে।