রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন
\ মো. মামুন ইসলাম \
রংপুর, ২৮ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর কাছ থেকে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট দখলের প্রচেষ্টায় তা ঘেরাও করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি শনিবার গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র তিন দিন পর, ১৯৭১ সালের এই দিনে, নির্ভীক বাঙালি বীরেরা বাঁশের লাঠি, ধনুক-তীর, দা, কাস্তে, কুঠার ও বর্শার মতো দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ক্যান্টনমেন্টটি ঘেরাও করে বীরত্বের এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
এই অসম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ জন স্বাধীনতাকামী বাঙালি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, ওরাওঁ, সাঁওতাল ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ জাতীয় ঐক্য, বীরত্ব ও সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে জীবন উৎসর্গ করেন।
শনিবার সকালে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধারা সেই দিন শহীদ হওয়া বীর বাঙালিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে নগরীর নিসবেতগঞ্জের ‘রক্ত গৌরব’ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সাধারণ) মো. আব্দুল মোতালেব সরকার বিভাগীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথমে সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
পরে, বাংলাদেশ পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মজিদ আলী, জেলা প্রশাসক মো. এনামুল আহসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জয়নাল আবেদিন, রংপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম, রংপুর মেট্রোপলিটন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড ইউনিটের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ মিয়া এবং সদস্য-সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুস সাত্তারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এরপর, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা তাইয়েবুর রহমান হাই স্কুল’, জেমিসন নেসা হাই স্কুল, নিসবেতগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ‘রক্ত গৌরব’ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
পুষ্পস্তবক অর্পণের পর, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ সেখানে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের আত্মার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তারা বিশেষ মোনাজাত করেন।
আজ বাসস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক রংপুর জেলা কমান্ডার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মঞ্জুরুল ইসলাম ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওকে রংপুরের মানুষের অসীম বীরত্বের এক কাহিনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সেদিন সকাল থেকে রংপুর সদর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার ছাত্র, কৃষক, দিনমজুর ও সর্বস্তরের মানুষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিসবেতগঞ্জ এলাকায় সমবেত হন।
মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘বিশেষ করে সাহসী অসংখ্য সাঁওতাল ও ওরাওঁ সম্প্রদায়ের মানুষ তীর-ধনুক নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে এসেছিলেন।’
বিকেলে ঘাঘট নদীর তীরে নিসবেতগঞ্জ এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ সেনানিবাসের দিকে যেতে শুরু করলে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মেশিনগান দিয়ে গুলি বর্ষণ শুরু করে।
তিনি বলেন, ‘মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে এলাকাটি অচল হয়ে যায়। সেখানে ঘাঘট নদীর তীরে শত শত মৃতদেহ পড়ে ছিল। যারা তখনও বেঁচে ছিল, তাদের বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।’
তৎকালীন ২৯তম ক্যাভালরি রেজিমেন্টের মেজর নাসির উদ্দিন, যিনি এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং সেই সময় রংপুর সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন, তিনি তার ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’-তে এই তথ্যগুলো বর্ণনা করেছেন।
তিনি বর্ণনা করেন, ‘আহতদের আর্তনাদে পুরো এলাকার আকাশ ও বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সেই দিন সন্ধ্যার আগেই, আদেশ অনুযায়ী, শত শত মৃতদেহে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’
আগুনটা উজ্জ্বলভাবে জ্বলছিল। এই আগুন অন্য যে কোনো আগুনের চেয়ে অনেক বেশি লাল ছিল। এই শিখা অনেক বেশি তীব্রভাবে জ্বলেছিল।
তিনি বইটিতে লিখেন, ‘আমি ওই আগুনটা খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। আমি দেখলাম, কীভাবে অসহায় স্বাধীনতাকামী মানুষেরা পুড়ছিল।’
বইটিতে লেখা হয়, ‘ধারালো অস্ত্র, বর্শা, তীর ও ধনুকে সজ্জিত হয়ে স্বাধীনতাকামী বাঙালি মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ, ওরাওঁ, সাঁওতাল ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সেনানিবাসটি দখলের চেষ্টা করেছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘তখন বিকেল প্রায় ৪টা থেকে ৫টা, যখন হাজার হাজার স্বাধীনতাকামী বাঙালি যে কোনো মূল্যে সেনানিবাসটি দখল করার জন্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা থেকে জড়ো হচ্ছিল।’
তিনি বলেন, ‘তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৩তম ব্রিগেডের সদর দপ্তর রংপুর সেনানিবাসে মোতায়েন ছিল এবং এর অধীনে ছিল ৩য় বেঙ্গল, সৈয়দপুরের ২৬তম রেজিমেন্ট, ২৩তম ক্যাভালরি রেজিমেন্ট ও তার সহযোগী বাহিনী এবং ২৯তম ট্যাঙ্ক বাহিনী।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ মালিক ছিলেন তৎকালীন ব্রিগেড কমান্ডার এবং সেনানিবাসটি আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্র, কামান, ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য সরঞ্জাম, বিশাল পাকিস্তানি বাহিনী ও অবাঙালি বিহারীদের দিয়ে সজ্জিত ছিল।
পাকিস্তানি বাহিনী ও বিহারীরা শীঘ্রই স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ওপর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিবর্ষণ শুরু করে, এতে সেখানকার সবচেয়ে জঘন্য গণহত্যায় ৬০০ জনেরও বেশি নিহত ও আরও শত শত আহত হয়।
বইটিতে উল্লেখ করা হয়, ‘ঘাঘট নদীর তীরের বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের মাঠ রক্তসাগরে পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মালিক, কর্নেল সাগির এবং অবাঙালি বিহারী সৈন্য ও কর্মকর্তারা এই ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল।’