কাস্টমস সংস্কারের মাধ্যমে বাণিজ্য সহজীকরণ ও অধিক স্বচ্ছতায় গুরুত্ব দিচ্ছে এনবিআর : চেয়ারম্যান
ঢাকা, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, ব্যাপকভাবে কাস্টমস সংস্কারের মাধ্যমে বাণিজ্য সহজীকরণ, দ্রুত পণ্য খালাস এবং অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে এনবিআর।
আজ এনবিআর ভবনে আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো নিয়ম মেনে চলা করদাতাদের জন্য কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা এবং মিথ্যা ঘোষণা বা আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মতো রাজস্ব ফাঁকির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।’
বাংলাদেশ কাস্টমস আগামীকাল সোমবার ‘আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস ২০২৬’ পালন করবে। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে সমাজ সুরক্ষায় কাস্টমসের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবারের দিবসে বিশেষভাবে তুলে ধরা হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, কাস্টমস ভ্যালুয়েশনে শৃঙ্খলা আনতে বড় ধরনের সংস্কার চলছে, যাতে ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতেই শুল্কায়ন করা যায়। এর জন্য একটি ঝুঁকি-ভিত্তিক কায়িক পরীক্ষা ব্যবস্থা চালুর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সফটওয়্যারটি চালু হলে শুধু উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যগুলো পরীক্ষা করা হবে এবং কম-ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যগুলো কোনো কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই খালাস পাবে।
তিনি বলেন, পণ্য দ্রুত খালাসের জন্য ‘পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট’ (পণ্য খালাস পরবর্তী নিরীক্ষা)-এর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার প্রক্রিয়া সহজ করতে এখন থেকে সপ্তাহে ৭ দিন নমুনা সংগ্রহ করা হবে এবং আমদানিকারকরা সরকারি ল্যাবের পাশাপাশি স্বীকৃত বেসরকারি বা বিদেশি ল্যাব ব্যবহার করতে পারবেন।
রহমান বলেন, বৈধ ও নিয়মনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের ‘অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর’ (এইও) হিসেবে গ্রিন চ্যানেল সুবিধা দেওয়া হবে। আগামীকাল আরও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে এই লাইসেন্স দেওয়া হবে।
প্রি-অ্যারাইভাল কাস্টমস প্রসেসিং জোরদারের কথাও তুলে ধরে চেয়ারম্যান বলেন, পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগেই শুল্ক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে যাতে সময় সাশ্রয় হয়।
তিনি জানান, পণ্য খালাস আরও দ্রুত করতে এনবিআর তার আসাইকুডা সিস্টেমকে বন্দর অটোমেশন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে একীভূত করার কাজ করছে। এছাড়া ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো’র মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৯ লাখ সনদ ও পারমিট ইস্যু করা হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই এক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
চেয়ারম্যান জানান, চলতি জানুয়ারি থেকে কাস্টমস বন্ড অটোমেশন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে, ফলে কাগজপত্র ও বন্ড কমিশনারেটে ভিড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এখন অফিস থেকেই অনলাইনে বন্ডসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কাস্টমস ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক ইনভয়েস তথ্য সংযুক্ত করতে এনবিআর বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কাজ করছে। এতে মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিরোধ কমবে এবং আন্ডার ও ওভার-ইনভয়েসিং নজরদারি জোরদার হবে।
আমদানি মূল্য সঠিকভাবে নির্ধারণ ও অনিয়ম শনাক্ত করতে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ক্যাটালগ সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ এখন আমদানিনির্ভর শুল্ক থেকে সরে এসে আয়কর ও ভ্যাট সংগ্রহের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। জনস্বার্থ বিবেচনা করে ইতোমধ্যে ফল, খেজুর, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ ও চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এখন থেকে কাস্টমস ডেটা বা আমদানির তথ্য গোপনীয় থাকবে না, করদাতার পরিচয় সুরক্ষা নিশ্চিত করে তা এনবিআর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। এছাড়া, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় ভ্যাট রিফান্ড দেওয়া শুরু হয়েছে এবং কর কর্মকর্তা ও করদাতার সরাসরি যোগাযোগ কমাতে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় আয়কর রিফান্ড ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে।
পরিবর্তনশীল বিশ্ব ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রকৃতি ও ধরণ পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টে যাচ্ছে দেশের বর্ডার এজেন্সির কাজের কৌশল ও গুরুত্ব। রাজস্ব আহরণ যেখানে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হতো, সেখানে বর্তমানে তা পরিবর্তিত হয়ে বাণিজ্য সহজীকরণ, জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ, চোরাচালান ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধসহ নানাবিধ জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মত বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কাস্টমসের এই বহুমাত্রিক ভূমিকা তুলে ধরতে বিশ্ব কাস্টমস সংস্থা (ডব্লিউসিও) প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। ডব্লিউসিও নির্ধারিত আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য হলো— ‘সতর্কতা ও অঙ্গীকারের মাধ্যমে সমাজ সুরক্ষায় কাস্টমস।’
ফ্রন্টলাইন বর্ডার এজেন্সি হিসেবে বাংলাদেশ কাস্টমস সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর দিয়ে বাণিজ্য সহজীকরণ ও মাদক, অস্ত্র, অবৈধ স্বর্ণ, খাদ্য-ওষুধ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে।
বাংলাদেশ কাস্টমস পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে ডব্লিউটিও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (টিএফএ), ডব্লিউসিও রিভাইজড কিয়োটো কনভেনশন (আরকেসি), কাস্টমস মিউচুয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্স (সিএমএএ) এবং সার্ক, ডি-৮ সদস্যদেশ, তুরস্ক, সৌদি আরব ও জাপানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক চুক্তির আওতায় সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে।
চোরাচালান শনাক্ত ও প্রতিরোধে ডব্লিউসিওর রিজিওনাল ইন্টেলিজেন্স লিয়াজোঁ অফিস (রিলো) ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্কসহ (সিইএন) বিভিন্ন টুল ব্যবহার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কাস্টমস দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্বের ২৭ শতাংশ এসেছে কাস্টমস থেকে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক ও কর যৌক্তিককরণ, দেশীয় শিল্পে সুরক্ষা ও রেয়াত, বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ডিউটি ড্রব্যাক সুবিধার মাধ্যমে রপ্তানি সহায়তা, এলডিসি উত্তরণজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বাণিজ্য সহজীকরণে মেধাস্বত্ব বিধিমালা বাস্তবায়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কাস্টমস আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি দ্রুততর করছে। আসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, আইবাস++ ইন্টিগ্রেশন, বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) এবং স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার কার্যকর ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে পণ্যচালান খালাস সহজ ও পেপারলেস হয়েছে।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা, চোরাচালানকারীসহ আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসে জড়িতদের নিত্যনতুন কলাকৌশল, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
উচ্চ পেশাদারিত্ব, বিশেষায়িত জ্ঞান, দেশি-বিদেশি অংশীজনদের সাথে সহযোগিতা বজায় রাখাসহ যুগোপযোগী কর্মকৌশলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কাস্টমস এ সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র তথা সারা বিশ্বে আর্থ-সামাজিক সুরক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে বলে জানিয়েছে এনবিআর।