শিরোনাম

আজাদ রুহুল আমিন
বাগেরহাট, ১৭ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : জেলার কচুয়া উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের প্রমত্তা ভৈরব নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের অবৈধ দখল আর হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নিক্ষেপের ফলে নদীটি এখন মৃতপ্রায় খালে পরিণত হতে চলেছে। এ ছাড়া নদীতে চলাচলকারী নৌযানের পোড়া তেল, মানুষের পয়োবর্জ্য ও গ্রহস্থালি বর্জ্য পড়ে দূষিত হচ্ছে হছে এ নদীর পানি। ভৈরব নদীতে চলছে যেন দখলের মহাউৎসব। এ নদীর অস্তিত্ব কত দিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন এলাকাবাসী।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর দুই পাড়ে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ভূমিদস্যুরা অবৈধভাবে পাড় দখল করে স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে তুলেছে। কোথাও কোথাও নদী ভরাট করে দোকানঘর, এমনকি বাসাবাড়িও নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর বুক চিরে গড়ে ওঠা এসব অবৈধ স্থাপনার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
হোটেল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের পাশাপাশি ভৈরব নদীকে যেন ময়লা ফেলার ভাগাড়ে পরিণত করেছে স্থানীয় এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। কচুয়া বাজারের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁর পচা-বাসি খাবার, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পয়ঃনিষ্কাশনের ড্রেন সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশেছে। এতে নদীর পানি শুধু ব্যবহারের অনুপযোগীই হয়ে পড়েনি, বরং ছড়াচ্ছে উৎকট দুর্গন্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এস. এম. ওয়াজেদ আলী বাসসকে জানান, "আমরা ছোটবেলায় এই নদীতে বড় বড় লঞ্চ, স্টিমার ও নৌকা চলতে দেখেছি। এখন নদীটা দখল হতে হতে সরু হয়ে গেছে। ময়লা ফেলে পানি এতটাই বিষাক্ত করা হয়েছে যে, এখন গায়ের চামড়ায় লাগলে চুলকানি শুরু হয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনদুপুরে দখল ও দূষণ চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চললেও কিছুদিন যেতে না যেতেই পরিস্থিতি আবার আগের রূপে ফিরে আসে।
এলাকার সিদ্দিক প্রফেসর বাসসকে জানান, অবিলম্বে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী নদী জরিপ করে সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। ভৈরব নদীকে বাঁচাতে নদীর ভেতরে থাকা সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করতে হবে।
কচুয়ার ব্যবসায়ী বিএনপির সভাপতি সরদার জাহিদ বাসসকে জানান, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় ভৈরব নদীকে বাঁচাতে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এ ঐতিহাসিক নদীটি, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে পুরো কচুয়া অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপর।
তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে ১৯৭৭ সালে খাল খনন করে সবুজ বিপ্লবে পরিণত করেছিলেন। মাঝখানে অনেক শূন্যতার পর আবারও নতুন এ সরকার সারাদেশে খাল খনের কাজ শুরু করেছে। তাই সরকারের খাল কাটা কর্মসূিচতে ভৈরব নদী খননের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি।
কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী হাসান বাসসকে জানান, “ভৈরব নদী কচুয়া উপজেলার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলধারা। নদী দখল ও দূষণের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, নদীর সীমানা নির্ধারণের জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জরিপ কার্যক্রম গ্রহণ এবং অবৈধ দখল চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নদী রক্ষা একটি সমষ্টিগত দায়িত্ব। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের সহযোগিতা পেলে ভৈরব নদীকে দখল ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করি।”