শিরোনাম

হাফিজুর রহমান
বরগুনা, ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): জেলায় এবার সরিষার অধিক ফলনে কৃষকেরা খুশি। কুয়াশাছন্ন শীতের সকালে বরগুনায় শিশিরে ভেজা হলুদ সরিষা ফুলের ক্ষেতজুড়ে এক অপরূপ দৃশ্য বিরাজ করছে। বরগুনা সদর, পাথরঘাটা, আমতলী, তালতলী ও বেতাগী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা এখন সোনালি সরিষা ক্ষেতে সোনালি স্বপ্ন বুনছে। জেলার উপজেলার সরিষা ক্ষেতে হলুদ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আমন ধান কাটার পর পতিত ও একফসলি জমিতে সরিষা চাষ বেড়েছে। কম খরচে স্বল্প সময়ে অধিক ফলন পাওয়ায় কৃষকদের কাছে এটি লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে সরিষা চাষ। এবার জেলায় বারি-১৪, ১৭, ১৮, ১৯ ও টরি-৭সহ উচ্চফলনশীল জাতের সরিষা চাষ হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরিষা তোলার পর একই জমিতে বোরো ধান আবাদ করা যাবে। আর এতে কৃষকরা এক জমিতে দুই ফসল চাষ করে সুফল পাবেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরগুনা সদর উপজেলায় ১৪৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় পাঁচ হেক্টর বেশি। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। এবছর সদর উপজেলার নলটোনা এবং বুড়িরচর ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি সরিষার আবাদ হয়েছে। সরিষার উল্লেখযোগ্য জাত হলো, বারি সরিষা-১৭, বিনা সরিষা-৯, এবং বিনা সরিষা-১১।
সরেজমিনে বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের কৃষক হামেদ মৃধার (৬০) সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, খরচ কম হওয়ায় এবার বেশি জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। ১৪০০০ টাকা খরচ করে তিনি ৪০ কড়া জমিতে সরিষার আবাদ করেছেন। তার উৎপাদিত সরিষা বিক্রি করে ৪২০০০ টাকা আয় করেছেন বলে জানান তিনি।
সদর উপজেলার ঢলুয়া নলটোনা ইউনিয়নের কৃষক রবিউল (৫৫) জানান, এবার ২০ কড়া জমিতে ৭০০০ হাজার খরচ টাকা করে সরিষার আবাদ করে ৩ গুণ লাভ করেছেন। আগামীতে আরো বেশি করে সরিষা আবাদ করবেন বলে জানান তিনি।
বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নের ফুলতলা গ্রামের কৃষক গেন্দু মিয়া (৬২) জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার সরিষার অধিক ফলন হবে। তিনি ২০ কড়া জমিতে ছয় হাজার ৫০০ টাকা খরচ করে দিগুণের বেশি আয় করেছেন বলে জানিয়েছেন।
বরগুনা শহরের ভ্রাম্যমাণ সরিষা তেল ব্যবসায়ী কাইয়ুম হোসেন (৫২) বলেন, গত তিন বছর ধরে সরিষার তেলের ব্যবসা করে আসছেন। বরগুনায় ১২ মাস সরিষা পাওয়া যায় না, তাই উত্তরাঞ্চলের পাবনা জেলা থেকে সরিষা ক্রয় করে বরগুনায় এনে মেশিনে ভেঙে বিক্রি করেন।
তিনি জানান, প্রতি লিটার সরিষার তেল ২৪০ টাকা মূল্যে বিক্রি করে থাকেন। প্রতি মণ সরিষা ৩ হাজার ৭ শত টাকায় ক্রয় করে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে থাকেন। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার তেল বিক্রি করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, বরগুনায় সরিষা তেলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে, কিন্তু বরগুনাতে সরিষার চাষ কম হওয়ায় অন্যান্য জেলা থেকে সরিষা ক্রয় করতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার লাকুরতলা এলাকার তেল ব্যবসায়ী মজিবর (৫৬) বলেন, বরগুনায় নলটোনা ইউনিয়নে যে আবাদকৃত সরিষা আমি ক্রয় করে মেশিনে ভেঙে শহরের বিভিন্ন এলাকায় কেজি প্রতি -২৪০ টাকা দরে বিক্রি করি। প্রতি কেজিতে ৩০ টাকা লাভ হয়। জেলায় সরিষার তেলের অনেক চাহিদা আছে। বরগুনায় ১২ মাস সরিষা উৎপাদন হলে জেলার মানুষের ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণ হতো।
বরগুনা সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, আমরা কৃষকদের এ বছর প্রণোদনা দিয়েছি। বিশেষ করে নলটোনা ইউনিয়নের কৃষকদের বেশি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এ ইউনিয়নের গাজীমাহমুদ গ্রামে এবার সরিষার অধিক ফলন হয়েছে। এছাড়া বুড়িরচর ইউনিয়নের গোলবুনিয়া গ্রামে ভালো ফলন হয়েছে।
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন বাসসকে বলেন, সরিষা একটি লাভজনক ফসল হওয়ায় উপজেলা কৃষি অফিস প্রদর্শনী বাস্তবায়ন, বীজ সহায়তা এবং উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে কৃষকদের সরিষা চাষে আগ্রহী করে গড়ে তুলছেন। সরিষার আবাদ বৃদ্ধিতে আমরা কৃষকদের রোপা আমন জাতের আবাদ করার পরামর্শ প্রদান করছি, যাতে তারা আগাম সরিষা বুনতে পারেন।
তিনি বলেন, এছাড়াও বিনা চাষে সরিষা আবাদেও দিনদিন কৃষকের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশা করি আগামীতে সদর উপজেলায় সরিষার আবাদ আরো বৃদ্ধি পাবে এবং ভোজ্য তেল হিসেবে সূর্যমুখীর পাশাপাশি সরিষার তেল ব্যবহারেও আমরা সবাইকে সচেতন করতে সক্ষম হবো।
বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রথীন্দ্রনাথ বিশ্বাস এ বিষয়ে বাসসকে বলেন, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর জেলায় সরিষার ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। হলুদ ফুলে ভরা সরিষা ক্ষেত শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং বরগুনার কৃষকের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সচেতন মহল মনে করছেন, বরগুনার কৃষি বিভাগ উদ্যোগ নিলে জেলায় ১২ মাস সরিষার আবাদ হতে পারে। এ এলাকার মানুষের দৈনন্দিন ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। সেক্ষেত্রে ক্রেতারা চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কম মূল্যে তেল ক্রয় করতে পারবে।