বাসস
  ০১ মার্চ ২০২৬, ১১:১৫
আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ১২:৩১

মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি নিহত

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ফাইল ছবি

ঢাকা, ১ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা পশ্চিমাদের ঘোষিত শত্রু আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক হামলার প্রথম দফাতেই নিহত হয়েছেন। রোববার দ্বিতীয় দিনেও হামলা অব্যাহত থাকে, কারণ দুই দেশ ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাতের লক্ষ্য নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাম বিচ থেকে এএফপি জানায়, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন রোববার ভোরে খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৮৬ বছর বয়সী ওই ধর্মীয় নেতার মৃত্যুর ঘোষণা দেন এবং তাকে 'ইতিহাসের অন্যতম দুষ্ট ব্যক্তি' বলে উল্লেখ করেন।

ইসরাইল থেকে প্রথম খামেনির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর তেহরানের রাস্তায় উল্লাসধ্বনি শোনা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা এএফপিকে জানান, খামেনির বাসভবনসংলগ্ন এলাকায় কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।

এই হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে ইরানি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক বিক্ষোভ দমন করে, যাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়।

রোববার ভোরেও তেহরানে জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ট্রাম্প বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন না হওয়া পর্যন্ত হামলা বন্ধ হবে না এবং তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে অস্ত্র নামানোর আহ্বান জানান।

ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেন, 'এটি ইরানি জনগণের জন্য তাদের দেশ পুনরুদ্ধারের একক বৃহত্তম সুযোগ।'

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একইভাবে ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, 'এটাই আপনাদের সময়—ঐক্যবদ্ধ হয়ে শাসনব্যবস্থা উৎখাত করুন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করুন।'

ইরান পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। এতে আবুধাবিতে অন্তত দুইজন এবং তেল আবিবে একজন নিহত হন। উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, খামেনির শীর্ষ উপদেষ্টা আলি শামখানি এবং ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ডের প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুরও নিহত হয়েছেন।

ইরানি গণমাধ্যম জানায়, হামলায় খামেনির কন্যা, জামাতা ও নাতনিও নিহত হয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য জীবিতদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, 'সাহসী সৈনিক ও মহান ইরানি জাতি আন্তর্জাতিক অত্যাচারীদের অবিস্মরণীয় শিক্ষা দেবে।'

উত্তরসূরি নিয়ে প্রশ্ন

খামেনির বয়সের কারণে তার উত্তরসূরি নিয়ে আগে থেকেই জল্পনা ছিল। তার মৃত্যুর পর অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বিপ্লবী গার্ডের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, কারণ তারা ইরানের অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রোথিত।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত পশ্চিমাপন্থী শাহর পুত্র রেজা পাহলভি সতর্ক করে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতর থেকে কোনো উত্তরসূরি এলে তা অবৈধ হবে।

তিনি ইরানিদের 'সতর্ক থাকার' আহ্বান জানান এবং বলেন, তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপযুক্ত সময়ে ব্যাপকভাবে রাস্তায় নামতে হবে।

ইরানে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির পর।

পাহলভি বলেন, 'তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কার্যত শেষ হয়ে গেছে এবং শিগগিরই ইতিহাসের আবর্জনার ঝুড়িতে নিক্ষিপ্ত হবে।'

ওয়াশিংটনের কাছে নির্বাসনে থাকা পাহলভি নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যদিও সব বিরোধী গোষ্ঠীর সমর্থন তিনি পান না।

ইরানজুড়ে হামলা

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ২০১ জন নিহত এবং ৭০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

ইরানের বিচার বিভাগ জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের একটি স্কুলে হামলায় ১০৮ জন নিহত হয়েছেন, যদিও ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে না পারায় এএফপি হতাহতের সংখ্যা বা ঘটনার পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

ইসরাইল ও উপসাগরে পরিস্থিতি

ইসরাইলে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়; বাসিন্দারা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেন, আর আকাশে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হওয়ার বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়।

ইসরাইলি জরুরি পরিষেবা জানায়, তেল আবিব এলাকায় এক নারী নিহত এবং প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের রাজধানীতে বিস্ফোরণের একাধিক শব্দ শোনা গেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি—যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর অবস্থান করছে—সেখান থেকেও ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।

আবুধাবিতে দুইজন নিহত হন। দুবাইয়ের কৃত্রিম দ্বীপ ‘দ্য পাম’-এ আগুন ও ধোঁয়া দেখা যায়; সেখানে চারজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়, যা উপসাগরীয় তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যদিও তা বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা পরিষ্কার নয়।

নজিরবিহীন মাত্রা

তেহরানের বাসিন্দারা স্বাভাবিক কাজকর্ম করছিলেন, এমন সময় হামলা শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনী দ্রুত রাস্তায় নেমে আসে, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং খুব কম মানুষ বাইরে বের হওয়ার ঝুঁকি নেন—এএফপির এক সাংবাদিক এমন দৃশ্য দেখেছেন।

একজন অফিসকর্মী এএফপিকে বলেন, 'আমি নিজের চোখে দুটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তুতে অনুভূমিকভাবে উড়তে দেখেছি।' পরে যোগাযোগ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিদেশি সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে এত বড় সামরিক অভিযান চালাল।

ইসরাইলের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির বলেন, এই অভিযান জুন মাসে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় 'সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায়' পরিচালিত হচ্ছে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, এটি তাদের বিমানবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক বিমান হামলা।

ইরান, ইরাক, কুয়েত, সিরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল আকাশপথ আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক উড়োজাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয় এবং বহু এয়ারলাইন মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট বাতিল করে।

হামলার আগে বৃহস্পতিবার জেনেভায় ট্রাম্পের দূতরা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেন।

ট্রাম্প বলেন, বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের নেতারা যথেষ্ট আপস করেননি, যদিও হামলার পর তিনি স্পষ্ট করেন যে লক্ষ্য পারমাণবিক চুক্তি নয়, বরং শাসন পরিবর্তন।

ওমান মধ্যস্থতা করছিল এবং শুক্রবার অগ্রগতির কথা জানিয়েছিল—ইরান ইউরেনিয়াম মজুত না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানানো হয়।

ওমান শনিবার তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। ইরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে হামলা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়; পরিষদ শনিবার জরুরি বৈঠক করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।