চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন আর্টেমিস নভোচারীরা
ঢাকা, ৫ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : আর্টেমিস মিশনের নভোচারীরা শনিবার তাদের বহুল প্রতীক্ষিত চন্দ্র অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছেন। চাঁদকে প্রদক্ষিণ করার সময় চন্দ্রপৃষ্ঠের যেসব বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ ও ছবি তুলতে হবে, তা খতিয়ে দেখছেন তারা।
হিউস্টন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, অভিযানের কর্মদিবস শুরুর প্রাক্কালে হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোল সেন্টারকে কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান বলেন, ‘নভোযানের ভেতরে সবার মনোবল এখন তুঙ্গে।’
নাসার তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) শনিবার বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে ঘুম থেকে ওঠার সময় নভোচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার মাইল (২ লাখ ৭১ হাজার ৯৭৯ কিলোমিটার) দূরে ছিলেন। আর যখন তারা এগিয়ে যাচ্ছেন তখন চাঁদ থেকে তাদের দূরত্ব ১ লাখ ১০ হাজার ৭০০ মাইল (১ লাখ ৭৮ হাজার ১৫৪ কিলোমিটার)।
প্রায় ১০ দিনের এই দীর্ঘ যাত্রার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি রবি ও সোমবারের মধ্যবর্তী রাতে সম্পন্ন হতে পারে। সে সময় নভোচারীরা ‘চাঁদের মহাকর্ষীয় বলয়ে’ (লুনার স্ফেয়ার অব ইনফ্লুয়েন্স) প্রবেশ করবেন। তখন মহাকাশযানটির ওপর পৃথিবীর চেয়ে চাঁদের মধ্যাকর্ষণ শক্তির টান বেশি থাকবে।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, ওরিয়ন মহাকাশযান চাঁদকে প্রদক্ষিণের সময় নভোচারীরা পৃথিবী থেকে মানুষের সর্বোচ্চ দূরত্বে যাওয়ার রেকর্ড গড়তে পারেন।
নাসা জানায়, স্ক্র্যাম্বলড এগ (ডিম দিয়ে তৈরি এক ধরণের খাবার) ও কফি দিয়ে নভোচারীরা তাদের দিন শুরু করেন। আর ঘুম ভেঙেছিল চ্যাপেল রোয়ানের জনপ্রিয় পপ গান ‘পিংক পনি ক্লাব’-এর সুরে।
মার্কিন নাগরিক রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কোচ ও ভিক্টর গ্লোভার এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন এই ঐতিহাসিক চন্দ্রাভিযানে রয়েছেন। তারা চাঁদের মহাকর্ষ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সেটির চারপাশে ঘুরে আবার ফিরে আসার এক ঐতিহাসিক যাত্রায় রয়েছেন।
ওয়াইজম্যান এই অভিযানকে ‘হারকিউলিয়ান’ বা অতিমানবীয় কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন। গত অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময় পর মানুষ এমনকিছু করতে যাচ্ছে।
শনিবার পরবর্তী সময়ে নভোযানটি হাতে চালানোর (ম্যানুয়াল পাইলটিং) মহড়া দেওয়ার কথা রয়েছে ভিক্টর গ্লোভারের। গভীর মহাকাশে নভোযানের সক্ষমতা সম্পর্কে নাসাকে আরও তথ্য দিতেই এই পরীক্ষা। এরপর চন্দ্রভ্রমণের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করার জন্য নির্দিষ্ট ‘চেকলিস্ট’ পর্যালোচনা করবেন ক্রুরা।
প্রাচীন লাভা প্রবাহ এবং উল্কাপাতের ফলে সৃষ্ট গর্তের ছবি তোলা ও বর্ণনা করার জন্য নভোচারীদের বিশেষ ভূতাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের অ্যাপোলো মিশনের তুলনায় তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদকে দেখার সুযোগ পাবেন।
অ্যাপোলোর মহাকাশযানগুলো চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০ মাইল ওপর দিয়ে উড়লেও, আর্টেমিস-২ এর ক্রুরা সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়ার সময় ৪ হাজার মাইলের বেশি দূরত্বে থাকবেন। এর ফলে তারা চাঁদের দুই মেরুসহ সম্পূর্ণ গোলাকার পৃষ্ঠটি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
মহাকাশে ছবি তোলার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রুরা। মহাকাশ ভ্রমণে নাসার সদ্য অনুমোদিত স্মার্টফোনও ব্যবহার করছেন তারা।
ইতোমধ্যে ওরিয়ন থেকে তোলা পৃথিবীর একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি প্রকাশ করেছে নাসা। যেখানে সাগরের গাঢ় নীল জলরাশি আর ভেসে থাকা সাদা মেঘের দৃশ্য ফুটে উঠেছে।
শুক্রবার এক ব্রিফিংয়ে নাসা কর্মকর্তা লাকিয়েশা হকিন্স কমান্ডার ওয়াইজম্যানের তোলা ছবিগুলোর প্রশংসা করে সেগুলোকে ‘অসাধারণ’ বলে অভিহিত করেন।
হকিন্স বলেন, ‘প্রথমবারের মতো নভোচারীসহ গভীর মহাকাশে মহাকাশযানটি পরিচালনা করছি এবং আমরা প্রতিনিয়ত এর খুঁটিনাটি শিখছি। প্রতিদিন আমাদের নতুন নতুন অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখা জরুরি।’
চাঁদে বারবার ফিরে যাওয়া এবং সেখানে একটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হলো এই আর্টেমিস-২ মিশন। ওই ঘাঁটিটি ভবিষ্যতে আরও দূরবর্তী মহাকাশ গবেষণার প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
ব্যাপক কৌতুহল নিবারণের এই অভিযানে দরকার নিখুঁত গাণিতিক হিসাব। তবে এর মধ্যেও নভোচারীরা তাদের শৈশবের মহাকাশ স্বপ্নগুলো পূরণ করার সুযোগ পাচ্ছেন। সম্প্রতি মহাকাশে ভেসে থাকার আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে জেরেমি হ্যানসেন বলেন, ‘এটি আমাকে একদম ছোট বাচ্চার মতো অনুভূতি দিচ্ছে।’