লালমনিরহাট-৩ আসনে জমজমাট নির্বাচনী মাঠ
-বিপুল ইসলাম-
লালমনিরহাট, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটে নির্বাচনী তৎপরতা জোরদার হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
জেলার তিনটি আসনের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনকে ঘিরে ভোটার ও প্রার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে।
এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ৯৭০ জন। লালমনিরহাট সদর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে শহর ও গ্রামের সমন্বিত ভোট-বাস্তবতায় প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের সমর্থন আদায়ে তৎপর প্রার্থীরা।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লালমনিরহাটের মানুষ আসন্ন নির্বাচনে সৎ, যোগ্য ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রতিনিধি প্রত্যাশা করছেন। তাদের চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্রে রয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, মোগলহাট স্থলবন্দর পুনরায় চালু ও আধুনিকায়ন, বিমানবন্দর চালু ও সংস্কার, বেকার যুবক ও নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়ন।
এছাড়া এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পকারখানা ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন এবং আধুনিক রেলস্টেশন নির্মাণের দাবিও গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে মাদকমুক্ত সমাজ, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কৃষক, পরিবহনশ্রমিক ও তরুণ ভোটাররা।
লালমনিরহাট-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু, জামায়াতে ইসলামীর মো. আবু তাহের, গণসংহতি আন্দোলনের দীপক কুমার রায়, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মধুসূদন রায়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মইনুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির মো. জাহিদ হাসান এবং এবি পার্টির মো. ফিরোজ কবির।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় বিএনপির আসাদুল হাবিব দুলু ও জামায়াতের মো. আবু তাহেরকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জনগণের প্রত্যাশা তুলে ধরে জামায়াতের প্রার্থী মো. আবু তাহের বাসসকে বলেন, নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। তিনি সদর হাসপাতালকে আধুনিকায়ন, দক্ষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেকারদের দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান, মাদক নির্মূল এবং কৃষকদের ন্যায্য সার ও ফসলের দাম নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি সবজি সংরক্ষণে কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন ও নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
এছাড়া এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন বৃদ্ধি ও স্থায়ী ক্যাম্পাস উন্নয়ন, মোগলহাট স্থলবন্দর পুনর্গঠন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং তিস্তার পাড়ের অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর আশ্বাস দেন তিনি।
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে আবু তাহের বলেন, এটি বাস্তবায়ন ও আইনি স্বীকৃতি পাওয়াই তাদের দাবি; ভোট ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় তিনি ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও আনন্দমুখর হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
ভোটারদের প্রত্যাশা ও চাওয়া-পাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সীমান্তবর্তী লালমনিরহাট দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বঞ্চনার শিকার হওয়ায় এ এলাকার মানুষের প্রত্যাশা তুলনামূলকভাবে বেশি।
তিনি জানান, তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সমস্যা চিহ্নিত করে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন।
দুলু বলেন, নির্বাচিত হলে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন এবং জনগণের যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন। পাশাপাশি ভোটারদের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন তিনি।
তার ভাষায়, ক্ষমতায় গেলে জনগণের অভিযোগ জানানোর প্রয়োজনই খুব বেশি থাকবে না—নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি জনগণের পাশে থাকতে চান।
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী বলেন, এবারের নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশাবাদী। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণে ইতিবাচক সাড়া মিলছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানান, সব ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এইচ এম রকিব হায়দার বাসসকে বলেন, ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট কিংবা ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়মের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে।
সব মিলিয়ে লালমনিরহাট-৩ আসনে ভোটের মাঠ এখন জমজমাট। উন্নয়ন, তিস্তা ও কর্মসংস্থান—এই তিন ইস্যুই নির্ধারণ করবে কার হাতে যাবে সদর আসনের প্রতিনিধিত্ব।