ফেনীর প্রাণকেন্দ্র রাজাঝির দিঘিকে বাঁচাতে সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান
॥ মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন ॥
ফেনী, ৮ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ফেনীর প্রাণকেন্দ্র ‘রাজাঝির দিঘি’ বা ‘রাজনন্দিনী দিঘি’| ১৮৭৫ সালে এই দিঘিকে কেন্দ্র করেই ফেনী মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয়| তারপর একে একে গড়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা| কালের পরিক্রমায় ফেনী মহকুমা থেকে জেলায় পরিণত হয়েছে| জেলার নানামুখী উন্নয়ন হয়েছে| বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে| তা বলে রাজাঝির দিঘির গুরুত্ব এতখানি কমেনি|
কিন্তু ফেনী শহরের জন্ম সাক্ষী এই রাজাঝির দিঘি এখন দখল দূষণে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে| দিঘিটির চারদিকে পাড়ে সড়ক থাকলেও যান চলাতো দূরের কথা পায়ে হাঁটাও দায়| বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব পাড় পুরোই জবর দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে শত শত দোকান| এসব দোকানের সমস্ত আবর্জনা ফেলা হচ্ছে দীঘিতে| যেন এর কোনো মা-বাপ নেই| এতে করে দিঘি ও আশপাশের পুরো এলাকাই এখন ভয়াবহ দূষণের কবলে|
ফেনী জেলার ইতিহাস পাঠে জানা যায়, এই রাজাঝির দিঘিকে ঘিরেই ১৮৭৫ সালে ফেনী মহকুমা সদর দপ্তর গড়ে তোলা হয়| জেলায় উন্নীত হওয়ার পরও দিঘির পূর্ব পাড়ে জেলা ও দায়রা জজ আদালত, পশ্চিম পাড়েও আদালত ভবন, অফিসার্স ক্লাব, কোর্ট মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও বাসভবন, ফেনী মডেল থানা, পশ্চিম উত্তর কোনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উত্তর পাড়ে সড়ক ও জনপথের ডাক বাংলোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিলো|
পরবর্তীতে জেলা সদর দপ্তর অন্যত্র সরিয়ে নিলে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও আদালত সেখানে স্থানান্তর করা হয়| কিন্তু এখনও দিঘির পূর্ব পাড়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ডরমেটরি ভবন, নবীন চন্দ্র সেন পাবলিক লাইব্রেরি, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, পূর্ব দক্ষিণ কোণে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, পশ্চিম পাড়ে কোর্ট মসজিদ, জেলা আইনজীবী সমিতি ভবন, অফিসার্স ক্লাব, মহিলা সংস্থা, ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেল, উত্তরপাড়ে ফেনী হার্ট ফাউন্ডেশন, সড়ক ও জনপথের ডাক বাংলোসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে| এছাড়া উত্তর পূর্ব কোণ ঘিরে গড়ে উঠেছে জেলা পরিষদ শিশু পার্ক| উত্তর পশ্চিম কোণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শিশু একাডেমিকে|
কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি উপেক্ষা করে দখল ও দূষণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে দিঘি ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা|
সরেজমিনে দেখা যায়, দিঘির পূর্ব ও দক্ষিণ পাড় দখল করে অন্তত ৪০০ দোকান গড়ে উঠেছে| এখানে ˆতরি পোশাক ছাড়াও বিভিন্ন রকমের দোকানপাট এর আড়ালে চলছে মাদকের রমরমা কারবার| সেই সাথে আছে কিশোর গ্যাং-এর দাপটও| গত তিন মাসে কিশোর গ্যাং-এর হামলায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা ছাড়াও পথচারী আহত হয়েছেন| এছাড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের এই দীঘিতে গত তিন মাসে অন্তত দুইটি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হয়েছে| এই স্থাপনাসমূহ উচ্ছেদে প্রশাসন বারবার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়নি| এর আগে কয়েক দফা উচ্ছেদ হলেও কিছুদিন পর আবার পুরোনো চেহারায় ফিরে যায় দিঘির পাড়|
দিঘির পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ফেনী পৌরসভা দৃষ্টি নন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করলেও, অবৈধ স্থাপনাসমূহ ও কিশোর গ্যাং এর উৎপাতে হাঁটাচলার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে|
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও শহর ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বায়ক আলাল উদ্দিন আলাল বাসসকে বলেন, রাজাঝির দিঘি ফেনীর ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান| এই দিঘিটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জঞ্জালে পরিণত হয়েছে| সমস্ত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রয়োজনে হকারদের সান্ধ্যকালীন বাজারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে| এতে করে দিঘির সৌন্দর্য যেমন পুনরুদ্ধার হবে তেমনি হকারদেরও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হতে পারে|
জেলা প্রশাসক মনিরা হক বাসসকে বলেন, রাজাঝির দিঘি প্রসঙ্গ নিয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটিসহ বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে| সরেজমিন পরিদর্শন করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বিধি মোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে|
তিনি বলেন, এর আগে বিভিন্ন সময়ে দিঘির পাড় দখল মুক্ত করা হলেও পরবর্তীতে হকারদের দখলে চলে যায়| শহরের প্রধান প্রধান সড়কের ফুটপাত ও দীঘিরপাড় হকার মুক্ত রাখতে হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসনে জেলা প্রশাসনের পরিকল্পনা রয়েছে|
রাজাঝির দিঘির পাড় অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে জেলা প্রশাসক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সব মহলে সচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন| তিনি সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান|
স্থানীয় লোককথা ও বিশ্বাস অনুযায়ী, ত্রিপুরার কোনো এক প্রভাবশালী রাজা তার কন্যার চোখের আলো ফিরে পেতে দশ দশমিক বত্রিশ একর জায়গা জুড়ে এই দিঘিটি খনন করেন| সেখান থেকেই এই দিঘির নাম হয় রাজাঝির দিঘি (এখানকার আঞ্চলিক ভাষায় কন্যাকে ‘ঝি’ বলা হয়)| অন্য সূত্রমতে, এই দীঘিটিকে রাজনন্দিনীর দিঘি বলেও কোথাও কোথাও উল্লেখ আছে|
একসময় ফেনীতে কেউ বেড়াতে আসলে প্রথমেই ছুটে যেতেন রাজাঝির দিঘির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে| এখানকার নির্মল জলরাশি আর মুক্ত হাওয়ায় প্রাণ খুলে শ্বাস নিতো দর্শনার্থীরা| কিন্তু অবৈধ দখল আর দূষণে এখন দিঘিটির প্রাণ যায় যায়|