শিরোনাম

এনামুল হক এনা
পটুয়াখালী, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : নোনতা হাওয়ায় গোলের নোনতা গুড়ের দারুণ সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন পটুয়াখালীর উপকূলবাসী। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘুম ভাঙে বাবুল চন্দ্র মিস্ত্রীর। চারপাশে তখনো কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার। কুয়াশার সঙ্গে ভেসে আসে নদীর নোনতা গন্ধ। বাঁশের মই কাঁধে নিয়ে তিনি হেঁটে যান ম্যানগ্রোভের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা গোলগাছগুলোর দিকে। এই গাছগুলোই তাঁর জীবনের প্রধান অবলম্বন। এখান থেকেই আসে সংসার চালানোর রস, এখান থেকেই জন্ম নেয় টিকে থাকার আশা।
পটুয়াখালীর উপকূল মানেই অনিশ্চয়তা। কখনো জোয়ার, কখনো ভাটা, আবার কখনো ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা। লবণাক্ত মাটিতে ফসল ফলানো যেমন কঠিন, তেমনি নিয়মিত কাজের সুযোগও সীমিত। এমন বাস্তবতায় প্রকৃতি যেন উপকূলবাসীর জন্য রেখে দিয়েছে এক অনন্য উপহার—গোলগাছ। লবণাক্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই গাছের রস থেকে তৈরি হয় বিশেষ স্বাদের গোলের গুড়, যার নোনতা-মিষ্টি স্বাদ ও ঘ্রাণ সহজেই আলাদা করে চেনা যায়।
সরেজমিনে কলাপাড়া উপজেলার বাবুল চন্দ্র মিস্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সন্ধ্যা নামলেই গোলগাছে মাটির কলস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সারারাত ফোঁটা ফোঁটা করে সেই কলসে জমে রস। ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি আবার ফিরে আসেন গোল গাছের বাগানে। নি:শব্দে অতি সাবধানে রস ভর্তি কলস নামান। এরপর সেই রস নিয়ে যাওয়া হয় চাতালে।
জ্বলে ওঠে চাতালে বড় হাঁড়ি বসিয়ে তাতে ঢালা হয় গোল গাছের রস। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেওয়ার পর ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ওঠে তরল রস। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক ধরনের মিষ্টি সুবাস। আর এ সুবাসই জানিয়ে দেয়, তৈরি হচ্ছে গোলের গুড়। আগুনের তাপে পুড়ে যাওয়া হাত আর চোখে না-ঘুমানোর ক্লান্তি সত্ত্বেও বাবুলের মুখে থাকে প্রশান্তির ছাপ।
তিনি বাসসকে বলেন, এই তিন মাসই আমাদের সারা বছরের ভরসা। এই সময় যা আয় হয়, তা দিয়েই বছরের অনেকটা চলে।
শীত মৌসুম এলেই পটুয়াখালীর উপকূলজুড়ে বদলে যায় জীবনের গতি। নীলগঞ্জ, কলাপাড়া, মহিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত পরিবার গোলের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কোথাও রাত জেগে রস সংগ্রহ, আবার কোথাও ভোর থেকে চাতালে গুড় জাল দেওয়ার দৃশ্য, সব মিলিয়ে উপকূলজুড়ে সৃষ্টি হয় এক কর্মচাঞ্চল্য পরিবেশ।
বর্তমানে পটুয়াখালী জেলায় প্রায় ১০০ হেক্টর এলাকাজুড়ে গোলগাছ রয়েছে। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছে পাঁচ শতাধিক পরিবার। কারও কাছে এটি পারিবারিক ঐতিহ্য, আবার অনেকের কাছে বিকল্প আয়ের প্রধান উৎস।
নীলগঞ্জ এলাকার গোলের গুড় উৎপাদক শ্যামল চন্দ্র পাল বলেন, নোনতা জমিতে ফসল হয় না, কিন্তু গোলগাছ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। পরিশ্রম বেশি, কিন্তু আয়টা নিশ্চিত।
মহিপুরের গোলের গুড় প্রস্তুতকারক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আগে শুধু স্থানীয় হাটে এ গোলের গুড় বিক্রি হতো। এখন পাইকাররা বাড়ি থেকেই গুড় নিয়ে যায়। দাম ভালো পাওয়ায় দিন দিন গোলের গুড় উৎপাদনের আগ্রহও বেড়েছে।
কলাপাড়া উপজেলার নারী উৎপাদক রেণুকা রানী দাস বলেন, স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর গোলের কাজে যুক্ত হই। এই আয়েই সংসার চলে, মেয়ের পড়াশোনাও চালাতে পারছি। একই এলাকার অভিজ্ঞ গোলগাছি নিতাই চন্দ্র হালদার বলেন, প্রকৃতির নিয়ম মেনে কাজ করতে হয়। বেশি লোভ করলে রস নষ্ট হয়ে যায়। ধৈর্য থাকলেই ভালো গুড় পাওয়া যায়।
একসময় গোলের গুড় শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে পাইকারদের মাধ্যমে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যাচ্ছে। শহরের ভোক্তারাও আগ্রহ নিয়ে কিনছেন ম্যানগ্রোভের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা গোলগাছ থেকে উৎপাদিত এই প্রাকৃতিক গুড়। ফলে চাহিদা ও দাম—দুটোই বেড়েছে।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে কেজিপ্রতি ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে গোলের গুড়। একজন উৎপাদক দিনে গড়ে সাত থেকে আট কেজি গুড় তৈরি করতে পারেন। এতে দৈনিক আয় হচ্ছে প্রায় দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা। মৌসুমি হলেও উৎপাদিত গোলের গুড়ের আয় উপকূলের দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বড় সহায়তা।
একজন স্থানীয় উৎপাদক বলেন, এই আয়ে ছেলের পড়াশোনা চালাচ্ছি, সংসারের খরচও মেটে। গোল না থাকলে উপকূলে টিকে থাকা কঠিন হতো আমাদের মত দরিদ্র পরিবারগুলোর।
গোলের গুড় কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের সংগ্রাম, ধৈর্য এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের প্রতীক। এখানে নেই আধুনিক যন্ত্রপাতি বা বড় কারখানা। আছে মানুষের হাতের কাজ, অভিজ্ঞতা আর প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলার শিক্ষা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহায়তা পেলে গোলের গুড় উপকূলীয় অর্থনীতির একটি টেকসই ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসম্মত প্যাকেজিং ও কার্যকর বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যের চাহিদা আরও বাড়বে।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম বাসসকে বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের রাখাইন জনগোষ্ঠী ঐতিহ্যগতভাবে গোলের গুর ব্যবহার করে আসছে। এটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পিঠা, পায়েস ও বিভিন্ন মিষ্টি জাত খাবার তৈরি করা হয়। গোলের গুর ডায়াবেটিস রোগীরাও পরিমিতভাবে গ্রহণ করতে পারেন।
তিনি জানান, কলাপাড়ায় বর্তমানে গোলের গুর উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫০০ জন কৃষককে প্রত্যেকের ২০ শতক জমিতে ২০১টি করে গোল গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় গোলের গুর একটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হিসেবে গড়ে উঠবে।