শিরোনাম

\ আবদুস সালাম আজাদ জুয়েল \
চাঁদপুর, ১০ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : মেঘনার ভাঙন রোধে ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৭ সালের মধ্যে শতভাগ বাঁধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে বলে নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল হক।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামিলীগ সরকারের আমলে মেঘনার ভাঙন রোধ ও চাঁদপুর শহর সংরক্ষণের জন্য সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সেটি অর্থ সংকটে আর আলোর মুখ দেখেনি। সর্বশেষ বিগত ২০২৪ সালের শুরুতে শহর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হয় ৮১৫.৬৫ কোটি টাকা। ৩.২২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই বাঁধ নির্মাণ কাজ এখন চলমান। ইতোমধ্যে ২৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ভাঙন কবলিত ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের দাবি, দুর্নীতির আশ্রয় না নিয়ে সরকারের নিয়োগকৃত সংস্থা যেন নির্মাণ কাজের সঠিক বাস্তবায়ন করে।
চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হচ্ছে পদ্মা-মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনা। বড় স্টেশন, মোলহেড এবং পুরাণ বাজার বাণিজ্যিক এলাকা থেকে হরিসভা পর্যন্ত। এসব এলাকায় প্রায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এবং পানি কমে গেলে বাঁধে ভাঙন ও ফাঁটল দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতি থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হলেও একটি শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণের দাবি ভুক্তভোগী স্থানীয়দের।
হরিসভা এলাকার বাসিন্দা সীতা রানী (৬৮) জানান, তিনি নিজেই এই এলাকায় ৩ থেকে ৪ বার মেঘনার ভাঙন দেখেছেন। সবকিছু হারিয়ে এখন রাস্তার পাশে ছিন্নমূল হিসেবে বসবাস করছেন। বাঁধ যেন সঠিকভাবে দেওয়া হয় এবং কাজে যেন দুর্নীতি না করা হয় সরকারের কাছে তিনি দাবি জানান।
মর্জিনা বেগম (৫০) বলেন, বর্ষা আসলেই ভাঙন শুরু হয়। তখন কিছুটা সংস্কার হলেও ভাঙনের ভয়ে আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না। এখন বাঁধের কাজ সম্পন্ন হলে এলাকার মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে।
পুরান বাজার এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান (৪৮) বলেন, প্রায় ৩০ বছর আগে থেকে এই এলাকায় মেঘনার ভাঙন শুরু হয়। কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে আমাদের বসতি ছিলো। এখন ভাঙন প্রতিরোধের কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হলে হয়ত বসবাসের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ভাঙনের শিকার হয়ে বেশ কয়েকটি পরিবার ছিন্নমূল। ৭০ বছর বয়সি ভুলু ঋষি বলেন, ‘ভাঙনে আমি সব হারিয়েছি। সামর্থ্য নেই কোথাও জমি কিনে বাড়ি করবো এজন্য সড়কের পাশে বসবাস করছি। ভাঙন প্রতিরোধে কাজ শুরু হয়েছে। সরকারের প্রয়োজনে এখান থেকে সরে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। তবে ছিন্নমূলদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা দরকার বলে আমি মনে করি।’
শহর সংরক্ষণ প্রকল্পে ১৯টি প্যাকেজে কাজ চলমান। জিও টেক্সটাইল ব্যাগে ডাম্পিং করার পর এখন চলছে ব্লক ডাম্পিং-এর কাজ। আর এই ব্লক তৈরিতে সনাতন পদ্ধতির পাশাপাশি এবার আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে ব্লক। প্রকল্পের পুরান বাজার জাফরাবাদ নদীর পাড়ে অটোমেটিক মেশিনে তৈরি হচ্ছে ব্লক।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসকে এমদাদুল হক আল মামুন এর সহকারী প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সুদীপ্ত গুন বলেন, শহর সংরক্ষণ প্রকল্পের অনেকগুলো প্যাকেজে কাজ হচ্ছে। এর মধ্যে অনেকেই সনাতনী পদ্ধতিতে ব্লক তৈরি করছেন। কিন্তু আমরা এই প্রথম বিদেশ থেকে আমদানিকৃত অটোমেটিক মেশিনে ব্লক তৈরি করছি।
এতে খুবই নিখুঁতভাবে ব্লক তৈরি হচ্ছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাহিদাও পূরণ হচ্ছে। আমাদের পাশাপাশি এই কাজের তত্ত্বাবধান করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল হক বলেন, শহর সংরক্ষণ প্রকল্পটি চাঁদপুরের মানুষের জন্য অনেক প্রত্যাশিত। ২০২৪ সালের জুন মাসে আমরা এই কাজ শুরু করেছি। ইতোমধ্যে জিও ব্যাগ ডাম্পিং শেষে ব্লক ডাম্পিং চলছে। কাজের প্রায় ২৫ ভাগ শেষ হয়েছে। আশা করি ব্লক প্লেসিংয়ের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এলাকার ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা হবে। কাজের বিষয়ে জেলা প্রশাসনসহ অংশীজনদের নিয়ে নিয়মিত সমন্বয় করা হয়।
বাঁধের পাশের ছিন্নমূল পরিবার সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা কাজ করতে গিয়ে পুরান বাজার কিছু পরিবারকে বাঁধের ওপর বসবাস করতে দেখেছি। তারা না থাকলে কাজটি সুন্দরভাবে করা সম্ভব হবে। আমরা উচ্ছেদ করলেও এটি জেলা প্রশাসকের সাথে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবো।