শিরোনাম

ঢাকা, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর আজ বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে কেবল একটি সময়সীমা বা ডেডলাইন হিসেবে না দেখে এটাকে অর্থনৈতিক দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালাগুলো মূলত একটি শক্তিশালী জাতীয় উন্নয়ন কৌশলেরই অংশ। যেখানে লজিস্টিকস, অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন অপরিহার্য।’
ঢাকার একটি হোটেলে ‘ব্যাংকিং খাতের ওপর এলডিসি উত্তরণের প্রভাব : বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়।
ড. মানসুর বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে অর্থনীতিকে প্রস্তুত করাই বেশি জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশকে আর দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের মতো সংগ্রামী দেশের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়; বরং থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে পৌঁছানোর লক্ষ্য স্থির করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না বাংলাদেশ এখন আর এলডিসি সম্প্রদায়ের অংশ।’ শুধু বাণিজ্য সুবিধার জন্য এলডিসি তকমা আঁকড়ে ধরলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈশ্বিক মর্যাদা ও সম্মান থেকে দেশ বঞ্চিত হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দক্ষতা অর্জনের জন্য গভর্নর উন্নত লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থা, সড়ক যোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং শিক্ষার উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, উন্নয়ন কৌশলে এমন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে যা দেশকে দক্ষ করে তোলে, ব্যয় কাঠামো প্রতিযোগিতামূলক করে এবং শ্রম ও শিল্পে উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।
আর্থিক খাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিনিময় হার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল না থাকলে উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি জানান, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আগামী জুনের মধ্যে কমপক্ষে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রিজার্ভ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী জুনে তা ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বিষয়ে গভর্নর বলেন, জবাবদিহিতার অভাবে বাজারে মূল্যস্ফীতির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে না পারলে বাজার দর স্থিতিশীল হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি জানান, গত কয়েক মাস ধরে টাকার বিনিময় হার ১২২.৩ টাকা প্রতি ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি বাজার থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা একদিকে রিজার্ভ বাড়িয়েছে এবং অন্যদিকে বাজারে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতিতে সরবরাহ করেছে।
সবশেষে ড. মনসুর বলেন, কাল্পনিক উত্তরণ তারিখ নিয়ে বিতর্ক না করে বাস্তব ও মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমি উত্তরণকে দেখি আমাদের অর্থনীতিকে প্রতিযোগিতাশীল করে তোলার প্রক্রিয়া হিসেবে।’
তিনি বিদ্যুৎ খরচ কমানো, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং শ্রম ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ব্যাংকিং কমিশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ. (রুমী) আলী স্বাগত বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।
মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, আইসিসি বাংলাদেশ সহসভাপতি এ কে আজাদ, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন এবং আইসিসি বাংলাদেশ সহসভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসের এজাজ বিজয়।
ব্যাংকিং খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণ তিনভাবে পরিবেশ বদলাবে—উন্নয়ন অর্থায়নের ধারা পরিবর্তন, বাণিজ্য ও রপ্তানি অর্থায়নের ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক ও কমপ্লায়েন্স প্রত্যাশা বৃদ্ধি।
তিনি বলেন, রেয়াতমূলক ও অর্ধ-রেয়াতমূলক বৈদেশিক অর্থায়ন কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের খরচ বাড়বে এবং প্রাপ্তি সীমিত হবে। ফলে দেশীয় আর্থিক ব্যবস্থা, বিশেষত ব্যাংকগুলোকে অবকাঠামো উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়ন এবং উৎপাদনশীল খাতকে সহায়তা দিতে হবে।
উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক, বিনিয়োগকারী ও করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকগুলোর কাছে মধ্যম আয়ের অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে বেসেল বাস্তবায়ন, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ (এএমএল-সিএফটি), পরিবেশ-সামাজিক-সুশাসন (ইএসজি), জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই অর্থায়নের ওপর প্রত্যাশা আরও জোরদার হবে।
তিনি বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং খাতে গুণগত রূপান্তর প্রয়োজন-যেখানে লেনদেনভিত্তিক ব্যাংকিং থেকে রূপান্তরমুখী ব্যাংকিং, শক্তিশালী সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি এবং সবুজ ও টেকসই অর্থায়নকে মূলধারায় আনতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান ও. রশীদ, প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক, পিকার্ড বাংলাদেশ-এর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম এবং ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিমীন রহমান প্রমুখ।