শিরোনাম

মো. আয়নাল হক
রাজশাহী, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : রাজশাহী অঞ্চলে নদীর চরে চাষাবাদ এখন ব্যাপক লাভজনক হয়ে উঠেছে। শীতকালীন শাকসবজি, ফলমূল ও নানা রকম অর্থকরী ফসলের ফলন ঘরে তুলে ভাগ্য বদলাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। তাদের এ সাফল্য নিজেদের সচ্ছলতার পাশাপাশি দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতেও বড় ভূমিকা রাখছে।
পদ্মা ও মহানন্দা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলোতে গত দুই দশক ধরে চাষাবাদ করে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকদের জীবনমান বদলে গেছে। রাজশাহীর পবা, গোদাগাড়ী ও বাঘা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষকরা এখন চরের জমিতে লাভের মুখ দেখছেন।
আগাম চাষাবাদের কারণে স্থানীয় বাজারে এখন শীতকালীন সবজির প্রচুর সরবরাহ রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, পদ্মা নদীর পলিমাটি চাষাবাদের জন্য অত্যন্ত উর্বর। এ মাটি চরাঞ্চলের কৃষিতে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। তারা এটিকে নদীর চরে কৃষির এক ‘নীরব বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেন।
চরের জমিতে চাষাবাদের খরচ অনেক কম, কিন্তু ফলন ও লাভ বেশি। অনেক কৃষক বছরে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
পবা উপজেলার চর খিদিরপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান (৪৮) জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে বেগুনের চাষ করেছেন এবং গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি পাইকারি ও খুচরা বাজারে বেশ ভালো দামে তা বিক্রি করছেন।
বুধবার সাহেব বাজার কাঁচাবাজারে নুরুজ্জামান বাসসকে বলেন, আগাম ফসল সবসময় লাভজনক হয়। কারণ এগুলো পাইকার, খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তাদের আকর্ষণ করে।
একই গ্রামের কৃষক তাইফুর রহমান (৫৪) সবজি চাষে এলাকায় রোল মডেলে পরিণত হয়েছেন। তিনি বছরে গড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আয় করেন।
বাঘা উপজেলার বাজুবাঘা নতুনপাড়া গ্রামের কৃষক জামিলুর রহমান পাঁচ বিঘা জমিতে গম চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তিনি এবার বাম্পার ফলনের আশা করছেন।
তিনি বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা এখন বাড়ির আঙিনার বাইরে বাণিজ্যিকভাবে সবজি চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
চরে উৎপাদিত বাড়তি সবজি এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে।
একই গ্রামের কৃষক রমজান আলী জানান, তিনি ২৫ হাজার টাকা খরচ করে এক একর জমিতে ফুলকপি ও বাঁধকপি চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমে তিনি এ থেকে প্রায় ৯৫ হাজার টাকা আয় করেছেন।
আমাদপুর গ্রামের কৃষক তোজাম্মেল হক, হাসেন আলী ও আসাদ উল্লাহর গল্পও একই। তারা চরের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাণিজ্যিক চাষাবাদ নিয়ে বেশ আশাবাদী।
বর্তমানে চরাঞ্চলে টমেটো, বেগুন, শিম, বিভিন্ন শাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, আলু, লাউ ও পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হচ্ছে। পাশাপাশি থাই পেয়ারা, আম ও কুলের মতো উচ্চ ফলনশীল ফল চাষও শুরু হয়েছে। অল্প সেচে গম, ভুট্টা, মসুর ডাল, সরিষা ও তিল চাষ করেও কৃষকরা সফল হচ্ছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চরের জমি ব্যবহার একটি কার্যকর কৌশল। নদীর বালুচর এখন আর অনাবাদি থাকছে না, বরং উৎপাদনশীল কৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে।
ডিএই-রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে চাষাবাদের ফলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করছে।
তিনি আরও জানান, রাজশাহী অঞ্চলে চরের কৃষি এখন আর শুধু নিজেদের অভাব মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বড় ধরনের বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। দেশের মানুষের ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদা মেটাতেও এটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।