শিরোনাম

/ মো. তানভীর হায়াত খান /
নেত্রকোণা, ১৮ মে, ২০২৬ (বাসস) : অতিবৃষ্টি আর মানবসৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় যখন কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনির সোনালি ফসল তলিয়ে যায় হাওরের উত্তাল আফালে। হাওরের ডুবন্ত সেই কাঁচা-পাকা ধান যখন বুকসমান জল থেকে ডাঙায় তুলে আনে কৃষক, তখন চারপাশের ভ্যাপসা গন্ধে বিষাদ নেমে আসে চিলতে উঠোনজুড়ে।
ফসলের মরণ কামড়ে যখন গ্রামীণ জনপদের শক্ত বুকের বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়—তখনও কি স্বপ্ন দেখা যায়? হ্যাঁ, দেখা যায়। যখন মাত্র ১২০ টাকার সরকারি ফিতে শতভাগ মেধা ও যোগ্যতার জোরে বাংলাদেশ পুলিশের চাকরি পেয়ে ৪২টি প্রান্তিক পরিবার নতুন করে বাঁচার আলো দেখে, তখন সেই ভাঙা বুকেও নতুন স্বপ্নের বীজ বোনা যায়।
‘সেবার ব্রতে চাকরি’—এ মূলমন্ত্রকে ধারণ করে নেত্রকোণা জেলা পুলিশ লাইন্স ড্রিল শেডে গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
কোনো প্রকার তদবির, ঘুষ বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নাম ও ফলাফল ঘোষণা করেন নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি এবং নেত্রকোণার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলাম।
ফলাফল ঘোষণার পরপরই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ৪২ জন তরুণ-তরুণীকে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়।
চূড়ান্ত তালিকায় নাম দেখে আনন্দাশ্রুতে ভেসে যান নির্বাচিতরা, যাদের সিংহভাগই অত্যন্ত সাধারণ কৃষক, দিনমজুর ও প্রান্তিক পরিবারের সন্তান।
যেখানে অতীতে পুলিশের চাকরির সমার্থক শব্দ হয়ে উঠেছিল লাখ লাখ টাকার লেনদেন, সেখানে মাত্র ১২০ টাকার সরকারি ফি দিয়ে চাকরি পেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে তাৎক্ষণিক অনুভূতি ব্যক্ত করেন প্রার্থীরা।
এবারের নিয়োগের সবচেয়ে মানবিক ও আবেগঘন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে নেত্রকোণা সরকারি শিশু পরিবারের (এতিমখানা) সন্তান মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে মা-বাবাহীন কামরুল বড় হয়েছেন এই সরকারি শিশু পরিবারেই। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করার। কিন্তু চেনা বাস্তবতায় যেখানে স্বপ্ন দেখাই ছিল দায়, সেখানে মাত্র ১২০ টাকা খরচে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার জোরে চাকরি পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কামরুল বাসস’কে বলেন, ‘আমি সরকারি শিশু পরিবারে বড় হয়েছি। আমার খুব স্বপ্ন ছিল পুলিশ হওয়ার। আল্লাহ তাআলা সবার দোয়ায় আজ আমার ওপর রহমত করেছেন। একটা স্বচ্ছ, সুন্দর ও নির্ভুল নিয়োগের মাধ্যমে আজ আমি পুলিশের সদস্য হতে পেরেছি।’
১২০ টাকায় শুধু পুলিশের চাকরি ই নয় বরং তা একটি সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও চোখের কোণে লেগে থাকা আনন্দ অশ্রু।
অনুরূপ গল্প বারহাট্টা থানার পাইকপাড়া গ্রামের আরিফা আক্তারেরও। তার বাবা মোহাম্মদ জসিম মিয়া পেশায় একজন সাধারণ কৃষক।
চরম আর্থিক অনটনের মাঝেও আরিফা দমে যাননি। এর আগে পরপর ২বার পুলিশে নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যর্থ হলেও বড় ভাই মোহাম্মদ তাজুল মিয়ার অনুপ্রেরণায় তিনি নিজের মনোবল ধরে রাখেন। অবশেষে তৃতীয়বারের চেষ্টায় শতভাগ মেধা ও যোগ্যতার জোরে মাত্র ১২০ টাকা খরচে চাকরি পেয়ে সফল হন তিনি।
আবেগাপ্লুত আরিফা আক্তার বাসস’কে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করার তীব্র ইচ্ছা ছিল। যেখানে আমাদের আর্থিক অবস্থা কোনোমতে চলার মতো, সেখানে এক টাকাও ঘুষ না দিয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিজের যোগ্যতায় আজ আমি চাকরি পেয়েছি। আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।’
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ‘ফেব্রুয়ারি-২০২৬’ এর এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনলাইন আবেদন শুরু হয়েছিল গত ৫ মার্চ ২০২৬ হতে ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত। নেত্রকোণা জেলা হতে সর্বমোট ৩ হাজার ১০৮ জন প্রার্থী অনলাইনে আবেদনপত্র দাখিল করেন।
এরপর গত ১৮, ১৯ ও ২০ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি. নেত্রকোণা পুলিশ লাইন্স মাঠে কয়েক ধাপে চলে কঠোর যাচাই-বাছাই। ১ম দিন (১৮ এপ্রিল) আবেদনকারী ৩ হাজার ১০৮ জনের মধ্যে শারীরিক মাপ ও কাগজপত্র যাচাই পরীক্ষায় ২ হাজার ২৯৪ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করেন এবং ১৫৫১ জন উত্তীর্ণ হন। ২য় দিন (১৯ এপ্রিল) ১ হ্জার ৫৫১ জনের মধ্যে ফিজিক্যাল এনডুরেন্স টেস্টের (২০০ মিটার দৌড়, পুশ-আপ, লং-জাম্প এবং হাই-জাম্প) মাধ্যমে ৮৩৭ জন এবং ৩য় দিন (২০ এপ্রিল) দৌড়, ড্র্যাগিং ও রোপ ক্লাইম্বিং শেষে ৪৭২ জন প্রার্থী প্রাথমিকভাবে উত্তীর্ণ হন।
শারীরিক যোগ্যতার কঠিন ধাপ পেরিয়ে ৪৬৯ জন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করেন। গত ৪ মে নেত্রকোণার আবু আব্বাছ ডিগ্রি কলেজে অত্যন্ত কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে এই লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ৪৬৩ জন প্রার্থী অংশ নেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা কর্তৃক খাতা মূল্যায়ন শেষে ১১৭ জন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
গতকাল ১৭ মে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করার পরপরই উত্তীর্ণ ১১৭ জনের মনস্তাত্ত্বিক ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। সবশেষে সকল ইভেন্টে কৃতকার্য প্রার্থীদের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম অনুযায়ী শূন্য পদের বিপরীতে মেধা ও বিভিন্ন কোটাসহ সর্বমোট ৪২ জন প্রার্থীকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
পেশাদারিত্বের আবহে মানবিকতার সুর
ড্রিল শেডের গুমোট রাত তখন আনন্দ আর বেদনার এক অদ্ভুত মোহনায় দাঁড়িয়ে। একপাশে মেধার জোরে জিতে যাওয়া ৪২টি নক্ষত্রের চোখে জল, অন্যপাশে সামান্য’র জন্য ছিটকে পড়া তরুণদের দীর্ঘশ্বাস। এমন এক আবেগঘন মুহূর্তে গাঢ় নীল পোশাকের কঠোর নিয়মের খোলস পেরিয়ে এক অভিভাবকের মতো পরম মমতায় সান্ত্বনা ও আশার বাণী নিয়ে দাঁড়ালেন জেলার পুলিশ প্রধান।
চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণদের অভিনন্দন জানিয়ে এবং অনুত্তীর্ণদের বুকে সাহস জুগিয়ে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন: ‘অনেক কষ্ট ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তোমরা এ পর্যন্ত পৌঁছেছো। এখন সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সাথে দেশসেবার মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কাজ করতে হবে।’
অনুত্তীর্ণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘যারা উত্তীর্ণ হতে পারোনি, তোমরা হতাশ হবে না; ভবিষ্যতে আবার চেষ্টা করবে। তোমাদের মধ্য থেকেই কেউ সার্জেন্ট হবে, কেউ সাব-ইন্সপেক্টর হবে এবং তোমরা নিশ্চয়ই ভালো কিছু করতে পারবে।’
ফলাফল ঘোষণার সময় নিয়োগ বোর্ডের সদস্য শেরপুর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা, ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মাহফুজা খাতুন উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও নেত্রকোণা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) স্বজল কুমার সরকারসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ফলাফল ঘোষণার পরপরই শুরু হয় ঝড়, দমকা হাওয়া আর ঝুম বৃষ্টি। এ যেন জীবনে সংগ্রামে টিকে থাকার জানান দিয়ে গেল শীতল বাতাসে।
সন্ধ্যা পেরিয়ে গভীর রাত যখন গভীর হওয়ার উপক্রম চাকরি পাওয়ার আনন্দে ড্রিল শেডের মেঝেতে কেউ আল্লাহর দরবারে সিজদায় শুকরানা আদায় করেন, কেউবা অন্ধকারে উন্মুক্ত আকাশে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেন, কেউ আবার বসে কাঁদতে থাকেন। কারো কান্না আরো বেশি পায় কাঙ্খিত এ চাকরি না পেয়ে। কেউ কেউ দৃঢ়চিত্তে সংকল্প করে সামনের বার ভালো করার।
পুলিশ লাইন্স গেইটে সারাদিন অপেক্ষায় ছিলেন তাদের স্বজনরা। চুড়ান্ত ফলাফল নিয়ে ৪২ জন যখন গেইটে যায় তখন সৃষ্টি হয় আরেক আবেগঘন পরিবেশ। মা-বাবা ভাই, বোনের সাথে আলিঙ্গন আর কান্নায় প্রকাশ পায় সফল হওয়ার আনন্দ।
আস্থার নতুন দিগন্ত হাওরের বুকচেরা কান্না আর বুকসমান জলের ভ্যাপসা গন্ধ ছাপিয়ে মেধার এই নিঃশব্দ বিপ্লব নেত্রকোণাবাসীর মনে এক নতুন ভোরের বার্তা দিয়ে গেল। প্রকৃতির বৈরিতার কাছে বারবার হেরে যাওয়া মানুষগুলো আজ বুক উঁচিয়ে বলতে পারছে—সততার হাত ধরেও ভাগ্যের চাকা ঘোরানো সম্ভব। ১২০ টাকার এই জাদুকরী আলো কেবল ৪২ জন তরুণের কাঁধেই পুলিশের গৌরবময় পোশাক তুলে দেয়নি, বরং সাধারণ মানুষের ম্রিয়মাণ বুকে রাষ্ট্র ও ব্যবস্থার প্রতি আস্থার এক অটুট বাঁধ নির্মাণ করে দিল।