বাসস
  ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৩২

সংরক্ষিত ধানের ক্ষতি কমাতে র্স্মাট আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন 

মোয়াজ্জেম হোসেন রোকন

ঢাকা, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস): দেশে ফসল উত্তোলন-পরবর্তী ক্ষতি কমিয়ে কৃষিকে আরও টেকসই ও আধুনিক করার লক্ষ্যে একটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আউয়াল।

সংরক্ষিত ধানকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি এই স্মার্ট আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘গ্রেইন গার্ড’। 

এটি এমন একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিভাইস, যা শ্রাব্যতার অতীত উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দতরঙ্গ তৈরি করে। এই তরঙ্গ ধানের ক্ষতিকর পোকা ‘রাইস উইভিল’-এর স্নায়ুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং তাদের চলাচল, খাদ্য গ্রহণ ও প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। ফলে পোকাগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে শস্য থেকে সরে যায়। এতে কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই শস্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

প্রধান গবেষক ড. মো. আব্দুল আউয়াল জানান, ডেভেলপমেন্ট অব স্মার্ট আল্ট্রাসনিক পেস্ট কন্ট্রোল সিস্টেম ফর পোস্ট-হারভেস্ট লস রিডাকশন ইন স্টোরড প্যাডি’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় পাঁচ বছর আগে ২০২০ সালে এর গবেষণা শুরু হয়। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার (বাউরিক)-এর অধীনে এজ (ইডিজিই) সাব-প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় বছর মেয়াদি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা হয়। তার নেতৃত্বে এবং সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. এহসানুল কবিরের অংশগ্রহণে একটি গবেষক দল ‘গ্রেইন গার্ড’ যন্ত্রটির উন্নয়ন, নকশা, পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ে যাচাই সম্পন্ন করেছে।

ড. মো. আব্দুল আউয়াল জানান, এই স্মার্ট আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তি কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই সংরক্ষিত ধানকে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর একটি সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তিনি বাসসকে জানান, যন্ত্রটি কয়েকমাস আগেই সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে গেছে। এখন বাণিজ্যিকভাবে বিপণনের অপেক্ষায় আছে। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যন্ত্রটি বাণিজ্যিকভাবে বিপণনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এদের মধ্যে এসিআই মোটরস লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বাসসকে আরো জানান, খুবই কম খরছে এই ডিভাইসটি বাজারজাত করা সম্ভব হবে। বাণিজ্যিকভাবে এটি তৈরি করা গেলে খুবই কম খরচে বাজারজাত করা যাবে। উৎপাদক প্রতিষ্ঠান তাদের লাভ্যাংশ যুক্ত করে বাজারে ছাড়ার পরও এর দাম কোনোভাবেই দুই হাজার টাকার বেশি হবে না। বরং এর অনেক কম হবে। 

তবে বাজারজাতের ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে নকল করে ডিভাইস তৈরি করা। প্রতারক চক্র নকল ডিভাইস তৈরি করে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে মানুষকে প্রতরাণার ফাঁদে ফেলে দেয়। প্রতিকার হিসেবে তিনি শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে পেটেন্ট রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন বলেও জানিয়েছেন। আইপি আবেদনও সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন ড. মো. আব্দুল আউয়াল।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্মার্ট আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন হলে দেশে সংরক্ষিত ধানের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং কৃষিখাতে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ধানের সংরক্ষণকালীন সময়ে মোট ধানের প্রায় ৭ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। এর প্রধান কারণ পোকামাকড়ের আক্রমণ। দেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া পোকা ও ছত্রাকের বিস্তারের জন্য অনুকূল হওয়ায় এই ক্ষতি আরও বেড়ে যায়। 

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যদি দেশের মোট ধান উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষতিও রোধ করা যায়, তাহলে বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার সাশ্রয় সম্ভব। পাশাপাশি ধানের বীজের অঙ্কুরোদগম হার অন্তত ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন বীজ সাশ্রয় হবে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।