শিরোনাম

ঢাকা, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ নিয়ে পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে এই ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র।
উল্লেখ্য, এই গবেষণায় সিগারেট সেবনকে মাদক ব্যবহার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আজ রোববার বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে আয়োজিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল— ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ: একটি জাতীয় গবেষণা’।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন— বিএমইউ’র ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।
এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহা-পরিচালক মো. হাসান মারুফ।
গবেষণার প্রধান গবেষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ’র ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী।
বিএমইউ’র ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম তার বক্তব্যে মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অধিকতর গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে কিছু খারাপ মানুষই শুধু মাদকাসক্ত এবং আমরা বা আমাদের সন্তানেরা নিরাপদ। বাস্তবতা হলো— আমরা সবাই মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছি। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সবাইকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাদক প্রতিরোধ একটি সামাজিক আন্দোলন ও একটি সামাজিক যুদ্ধ। সম্মিলিতভাবে আমাদের মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূলে পরিবার থেকেই প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা সেবা বিস্তারের লক্ষ্যে ঢাকা বিভাগের বাইরে আরও সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যা করে সাতটি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প বর্তমান সরকার অনুমোদন দিয়েছে।
বিএমইউ’র কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার তার বক্তব্যে মাদক সরবরাহের উৎস ও চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, আমাদের সমাজের শিশু ও তরুণরা জীবনের বাস্তবতা বোঝার আগেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এই শিশু ও তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
গবেষণাটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত গবেষণা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
গবেষণায় নেটওয়ার্ক স্কেল-আপ মেথড ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার ৬ দশমিক ০২ শতাংশ, রংপুরে ৬ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৫ দমমিক ৫০ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে কম, মাত্র ২ দশমিক ৭২ শতাংশ।
সংখ্যার দিক থেকে সর্বাধিক মাদক ব্যবহারকারী বসবাস করছে ঢাকা বিভাগে, প্রায় ২২ লাখ ৮৮ হাজার জন। এরপর চট্টগ্রামে প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার ও রংপুর বিভাগে প্রায় ১০ লাখ ৮১ হাজার মানুষ মাদক ব্যবহার করছে।
বিভাগ ভিত্তিক হিসেবে বরিশালে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪ লাখ ৪ হাজার ১১৮ জন, চট্টগ্রামে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন, ঢাকায় ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন, খুলনায় ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০ জন, ময়মনসিংহে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন, রাজশাহীতে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৯ জন, রংপুরে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন ও সিলেটে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন।
মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাঁজা (ক্যানাবিস) বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক। প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ গাঁজা ব্যবহার করে। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (মেথামফেটামিন), যা ব্যবহার করে প্রায় ২২ লাখ ৯৩ হাজার মানুষ।
অ্যালকোহল (অ্যালকোহল) ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ।
এছাড়া কোডিন ফসফেটযুক্ত কফ সিরাপ, হেরোইন, ঘুমের ওষুধ ও ইনহেল্যান্ট ব্যবহারের হারও উল্লেখযোগ্য। প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে। এদের এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
গবেষণায় আরও জানানো হয়, একজন মাদক ব্যবহারকারী মাসে গড়ে প্রায় ৬ হাজার টাকা ব্যয় করে।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে একজন ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদক ব্যবহার করতে পারে এবং মাদক ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ তরুণ বয়সেই মাদক গ্রহণ শুরু করে।
প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ব্যবহারকারী ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে।
বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
আশঙ্কাজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী মাদক সহজলভ্য বলে জানিয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, দেশে মাদক ব্যবহারকারীদের জন্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। যদিও অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক ও আর্থিক সহায়তার অভাবে অধিকাংশই সফল হতে পারেননি। মাদক ব্যবহারকারীরা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা, কাউন্সেলিং ও কর্মসংস্থান সহায়তাকে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
পাশাপাশি ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গবেষণার ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে মাদক সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট।
শুধুমাত্র দমনমূলক বা শাস্তিমূলক পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই গবেষণার তথ্যভিত্তিক প্রমাণ ভবিষ্যতে জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও কর্মসূচি গ্রহণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।