শিরোনাম

চট্টগ্রাম, ৮ জুন, ২০২৬ (বাসস): সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরকে স্থায়ীভাবে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনতে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় প্রাথমিকভাবে গত বৃহস্পতিবার থেকে সেখানে চারটি সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
সোমবার দুপুরে জঙ্গল সলিমপুরে সড়ক নির্মাণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের (ইসিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দখল, অবৈধ আধিপত্য আর বিচ্ছিন্নতার কারণে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকা চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এই পাহাড়ি জনপদে শুরু হয়েছে সড়ক নির্মাণকাজ। একসময় দিনের আলোতেও যেখানে যেতে ভয় পেতেন অনেক মানুষ, সেই জঙ্গল সলিমপুরে এখন শোনা যাচ্ছে এক্সকেভেটরের শব্দ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত এই উদ্যোগকে স্থানীয়রা দেখছেন উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নতুন আশা হিসেবে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ জানান, জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা থেকে আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত একটি সড়ক, আলীনগর-টেক্সটাইল হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত একটি সড়ক, আলীনগর থেকে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) পাশ দিয়ে ভাটিয়ারী-বালুচড়া লিংক রোড হয়ে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে সংযুক্ত আরেকটি সড়ক এবং জঙ্গল সলিমপুরের অভ্যন্তরে আরও একটি সড়ক নির্মাণ করা হবে।
স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর বিস্তৃত এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীর আধিপত্য ছিল। ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর মতো সন্ত্রাসী চক্র এখানে প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একাধিকবার অভিযান চালাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। অতীতে র্যাবের এক কর্মকর্তার প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে এই এলাকায়।
গত ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে গিয়ে এলাকাটিকে সন্ত্রাসমুক্ত করার ঘোষণা দেন। এরপর প্রশাসনের অনুরোধে সেনাবাহিনী এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি সড়ক নয়, বরং পুরো এলাকাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ২৬ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (২৬ ইসিবি)। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ভবিষ্যতে পুরো এলাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
২৬ ইসিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামরুল আল মাসুদ বলেন, বর্তমানে আলীনগর স্কুল থেকে সড়ক প্রশস্তকরণ ও মাটি কাটার কাজ চলছে। সড়কটির প্রস্থ হবে ১৮ ফুট। পাহাড়ি ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় অন্তত তিনটি বড় সেতু ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি পাহাড়ধস রোধে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি এলাকায় কাজ করা চ্যালেঞ্জিং হলেও বিশেষ কৌশলে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে মাটি কেটে রাস্তার ভিত্তি তৈরি করা হলে বৃষ্টির পানিতে মাটি স্বাভাবিকভাবে বসে যায়, যা পরবর্তীতে সড়ককে আরও টেকসই করে তোলে। সে কারণে বর্ষার মধ্যেও কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ছয় থেকে সাত মাস সময় লাগতে পারে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি সমন্বিতভাবে কাজ করছে। নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এসব সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ও নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, ফলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা আরও সহজ হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আক্কাস বলেন, এই সড়ক নির্মিত হলে জঙ্গল সলিমপুরের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে যাতায়াতের দুর্ভোগের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পিছিয়ে রয়েছে এলাকার মানুষ।