বাসস
  ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩:২৯

অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে ডি-রেগুলেশনের পথে হাঁটতে হবে : আমির খসরু

ছবি : বাসস

ঢাকা, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের পুঁজিবাজারসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাত দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ‘অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে ডি-রেগুলেশন ও উদারীকরণের পথে হাঁটতে হবে।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পোস্ট ইলেকশন ২০২৬ হোরাইজন, ইকোনোমি, পলিটিক্স অ্যান্ড ক্যাপিটাল মার্কেট’ শীর্ষক সেমিনারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি এবং দক্ষিণ এশীয় স্টক এক্সচেঞ্জসমূহের ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন।

সম্মেলনে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অংশগ্রহণ করেন।

আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল নীতিগত দিকনির্দেশনা, বাজারের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং বিদ্যমান ও সম্ভাব্য ঝুঁকি। অনুষ্ঠানের সূচনা করেন ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসানুর রহমান। স্বাগত বক্তব্যে তিনি সম্মেলনের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। এরপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন নীতি সংহতকরণ সংস্থা র‌্যাপিড এর চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা ও পরবর্তী আলোচনা পর্বে সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব করেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এবং ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডের পরিচালক সাইফুল ইসলাম। 

সম্মেলনে প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সিনিয়র নেতা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের মহাসচিব আতীকুর রহমান,  গবেষণা ও উন্নয়ন নীতি সংহতকরণ সংস্থা র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার ও চার্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল বিশ্লেষক  মো. সাইফুদ্দিন, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান এবং  সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশরুর আরেফিন অংশ নেন। 

আমির খসরু বলেন, দেশের অর্থনীতিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত আইন ও বিধিনিষেধ যুক্ত হয়েছে, যার অনেকগুলোই মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। “আপনি হয় বাজারব্যবস্থা রাখবেন, নয়তো রাখবেন না—দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়। বাজারের ওপর আস্থা রাখতে হলে বাজারকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে। 

তিনি জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের দিকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। “আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়া যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ সময় পর নাগরিকরা তাদের ভোটের মাধ্যমে এমন একটি সরকার গঠনের সুযোগ পাবেন, যারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে অনেক ফান্ড ম্যানেজার, যাদের মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও রয়েছেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, এ জন্য কঠোর সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। “বিনিময় হার, পুঁজিবাজার কিংবা আমদানি-রপ্তানি সব ক্ষেত্রেই বাজারকে সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে।

তিনি বলেন, গত দেড় বছরে দেশের অর্থনীতি একটি নিম্নস্তরের ভারসাম্যে চলে গেছে, যেখান থেকে বের হওয়াই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক সংস্কার, উদারীকরণ এবং বাজারমুখী নীতির বিকল্প নেই।

বিএনপির এ নেতা আরও বলেন, জিডিপির তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বাজার মূলধন অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তা জিডিপির দ্বিগুণ, ভারতে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৪০ শতাংশ। একটি অকার্যকর পুঁজিবাজার নিয়েও অর্থনীতি এতদূর এগিয়েছে—এটি অবাক করার মতো।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজার অকার্যকর হওয়ায় সবাই ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়েছে, ফলে স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণ বেড়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, ব্যাংক থেকে নেয়া কিছু ঋণ বিদেশে পাচার হয়ে আর্থিক খাতকে বিপর্যস্ত করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আমির খসরু বলেন, অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের বেশিরভাগ সমস্যার মূল কারণ হলো জবাবদিহিতার অভাব। একটি মুক্ত, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার এলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে।

তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজার কার্যকর না হওয়ায় সরকারকে আইএমএফসহ বিদেশি উৎস থেকে শর্তযুক্ত ঋণ নিতে হচ্ছে। অথচ সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা কিংবা রেলওয়ের মতো সংস্থাগুলো মিউনিসিপ্যাল বা সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বড় প্রকল্পের অর্থায়ন করতে পারত, যদি সঠিক পরিবেশ তৈরি করা যেত।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বর্তমানে প্রায় ৩৬ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, উইন্ডো ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়েছে। বাস্তব আর্থিক চিত্র তুলে আনলে খেলাপি ঋণ ৪০ শতাংশেও পৌঁছাতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

সবশেষে আমির খসরু বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যালান্স শিট নিশ্চিত করতে হবে। আমরা ক্ষমতায় গেলে নিয়ন্ত্রণের উদারীকরণ করবো, স্বচ্ছতা আনবো এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবো। বাজারকে বাজারের মতো চলতে দিতে পারলেই অর্থনীতি সঠিক পথে চলবে।