বাসস
  ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯:২৭

আগামীকাল জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট : রংপুর বিভাগে উৎসবমুখর পরিবেশ

ছবি : বাসস

মো. মামুন ইসলাম

রংপুর, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : রংপুর বিভাগের সর্বস্তরের মানুষ আগামীকাল ভোট দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।  সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

গত ১৭ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো এই বিভাগে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ঈদের মতো একটি চমৎকার উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে দেশের রাজধানী বা অন্যান্য এলাকায় কর্মরত হাজার-হাজার স্থানীয় ভোটার ভোট দেওয়ার জন্য তাদের নিজ-নিজ বাড়ি ফিরেছেন।

গত ২৪ ঘন্টায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে শত শত যাত্রীবাহী বাস তাদেরকে নিয়ে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও এবং দিনাজপুর জেলায় পৌঁছেছে।

রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক, যারা একই সাথে সেই জেলার রিটার্নিং অফিসার, আজ সকল ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী উপকরণ পাঠানোর পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মোতায়েনের কাজ সম্পন্ন করেছেন।

অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য রিটার্নিং অফিসাররা বিভাগব্যাপী নির্বাচন পর্যবেক্ষণ কমিটি, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সেল এবং নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ দল গঠন করেছেন।

আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, ২০২৬-এর সময় রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে যে-কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ প্রশাসন ছয়স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

ইতোমধ্যে, রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ জন ভোটারের জন্য মোট ৪ হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে।

এর মধ্যে প্রশাসন ২ হাজার ৫৬১টি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ৮২৭টি কেন্দ্র অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষ করে চরাঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা এবং কিছু প্রার্থীর বাড়ির কাছাকাছি কেন্দ্রগুলোতে ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ভোটকেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি, বিভাগের ৩৩টি আসনেই শরীরে ক্যামেরা লাগানো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা থাকবেন।

রংপুর রেঞ্জ পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, রংপুর বিভাগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত করতে ছয়স্তরের পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিভাগে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য এবং সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব/এসআইএফ) এবং আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

এই বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনে ৩০টি পৌরসভা এবং ৫৩৩টি ইউনিয়ন রয়েছে যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়াও, পুলিশ সদস্যদের শরীরে লাগানো ক্যামেরা থাকবে, যা উচ্চতর পর্যায় থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হবে।’

আজ বিকেলে বাসসের সাথে আলাপকালে, রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. দেওয়ার হোসেন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোট ২৩৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তিনি বলেন, ‘বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনে ৪ হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্রে পুরুষ ও নারী ভোটারসহ মোট ১ কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ জন ভোটার তাদের ভোট দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।’

জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ৩৩টি সংসদীয় আসনে বিচার বিভাগের অধীনে কর্মরত স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং নির্বাচনী তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারদের মতো নির্বাচনী কর্মকর্তারা, স্বচ্ছ ব্যালট বক্স এবং অন্যান্য নির্বাচনী উপকরণসহ আজ বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে সমস্ত ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে গেছে।’

রংপুর জেলা রিটার্নিং অফিসার এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান জানান, রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন।

তাদের মধ্যে, জেলায় ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন নারী এবং ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন পুরুষ এবং ৩১ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার।

জেলার মোট ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ও স্বতন্ত্র হিসেবে মোট ৪৪ জন প্রার্থী এই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

পুলিশ সূত্রে জানায়, রংপুরের ছয়টি সংসদীয় আসনের ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১৬টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২১৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১২১টি এবং রংপুর জেলা পুলিশের আওতাধীন আটটি উপজেলায় ৯৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ এই ভোটকেন্দ্রগুলিতে পুলিশ অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরাও স্থাপন করা হয়েছে।

রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হোসেন জানান, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য রংপুর জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ভোটার, প্রার্থী ও নির্বাচনী সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভোটকেন্দ্রের বাইরে ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় পর্যাপ্তসংখ্যক মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন ও সাব-সেক্টর এবং সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছে।

ভোটকেন্দ্রে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রগুলোতে পুলিশের শরীরে লাগানো ক্যামেরা থাকবে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মজিদ আলী বলেন, তিনটি সংসদীয় আসনের আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত রংপুর মহানগরীর ছয়টি থানায় ২০৪টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে।

এই স্থানগুলোতে ২০৪টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনসহ ১২১টি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

এছাড়াও, ৩০টি মোবাইল টহল দল এবং ৭৮টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স মহানগরীতে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা পেশাদারভাবে কাজ করবো এবং নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনকারী বা অপরাধে জড়িত কাউকে ছাড় দেবো না, যাতে উৎসবমুখর পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।’

এদিকে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬৬তম পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ রংপুর বিভাগের যে-কোনো নির্বাচনী এলাকায় যে-কোনো ধরনের অস্থির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং মোকাবিলা করতে প্রস্তুত রয়েছে।

নির্বাচনের দিন রংপুর বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তারা হেলিকপ্টারে সেখানে কমান্ডো গ্রুপ নামিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করবে।

এছাড়াও, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং শান্তি বজায় রাখার জন্য রংপুর বিভাগের চারটি জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এবং গাইবান্ধায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এসএম শফিকুর রহমান জানান, রংপুর বিজিবি সেক্টরের আওতাধীন এই চারটি জেলার ২৬টি বেস ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

রংপুর বিভাগের এই চারটি জেলায় ২ হাজার ৫৭২টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৬০০টি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র।

বিজিবি সদস্যরা মোবাইল এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছেন, যার মধ্যে রয়েছে- চেকপোস্ট স্থাপন, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা প্রদান ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বিশেষ মনোযোগ দেওয়া।