শিরোনাম

আল সাদী ভূঁইয়া
ঢাকা, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব সামলাচ্ছেন এ অঞ্চলের নারীরা। লবণাক্ততা, জীবিকা সংকট ও ঘন ঘন দুর্যোগে বিপর্যস্ত এসব এলাকায় কর্মসংস্থানের অভাবে পুরুষরা শহরমুখী। ফলে পরিবারের সব দায়িত্ব এসে পড়েছে নারীদের কাঁধে।
সংসার চালানো থেকে শুরু করে সন্তান লালন-পালন, নিরাপদ পানি সংগ্রহ ও আয়-রোজগার সবকিছু মিলিয়ে তাদের দৈনন্দিন কাজের চাপ অন্য অঞ্চলের নারীদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। প্রাকৃতিক, শারীরিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও এ অঞ্চলে পরিবারের সকল দায়িত্ব নারীদেরকেই পালন করতে হচ্ছে।
শ্যামনগরের মেয়েরা সাবালিকা হওয়ার পর থেকেই প্রকৃতির কাছে তারা কতটা অসহায় তা বুঝতে শুরু করে।
তাদের ভাগ্যটা এরকম যে বুঝলেও কিছু করার থাকে না। শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একজন মানুষের পুরো জীবনের ওপর কীভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ শ্যামনগরের নারীকূল।
জীবনের বিভিন্ন বাঁকে তাদের যে লড়াই, ত্যাগ ও অবর্ণনীয় কষ্টের বয়ান তার খবর কি রাখে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যারা দায়ী তারা? না, এ খবর কেউ রাখে না।
উপকূলীয় শ্যামনগরের কলবাড়ি এলাকার একটি সরকারি গুচ্ছগ্রামে বাস করছে ১৭ বছর বয়সী কিশোরী বুলবুলি (ছদ্মনাম)। তার রয়েছে অবর্ণনীয় জীবনসংগ্রাম। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙণ ও দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য সমস্যায় জর্জরিত তিনি।
বুলবুলি বর্তমানে স্থানীয় একটি পলিটেকনিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে বা ভ্যানে করে স্কুলে যাতায়াত করতে হয় তাকে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার মা দিনমজুরি ও রান্নার কাজ করে সংসার চালান।
তিনি জানান, তার বাবা বহু বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে থাকেন না। মাঝে মাঝে ফোনে যোগাযোগ হলেও কোনো আর্থিক বা মানসিক সহায়তা দেন না। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি তার মাকে একাই সংগ্রাম করতে দেখেছেন।
স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকেও বুলবুলি চরম সংকটে রয়েছেন। তার মাসিক শুরু হয় ১২ বছর বয়সে। তখন থেকেই অতিরিক্ত রক্তপাত, তীব্র পেটব্যথা, কোমর ও পা ব্যথা নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাসিক সাত থেকে আট দিন স্থায়ী হয় এবং অনেক সময় রক্তপাত স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হয়।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, চুলকানি ও ত্বকের এলার্জির সমস্যায় ভুগছেন তিনি। স্থানীয় ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকসহ একাধিক জায়গায় চিকিৎসা নিলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। একজন গাইনি চিকিৎসক আলট্রাসনোগ্রাফি ও পরীক্ষার পর জরায়ুতে প্রাথমিক সমস্যার ইঙ্গিত দেন এবং নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে অভাবের কারণে বুলবুলি পূর্ণ ডোজের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারছেন না।
মাসিকের সময় পুকুরের দূষিত পানিতে গোসল করতে বাধ্য হওয়ায় সংক্রমণ ও অস্বস্তি আরও বেড়ে যায় বলে জানান তিনি। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধার অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বুলবুলি জানান, মাসিকের ব্যথা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেক সময় স্কুলে অনুপস্থিত থাকতে হয়।
পরীক্ষার সময় এই সমস্যা হলে পড়াশোনায় মারাত্মক প্রভাব পড়ে। তবুও তিনি পড়াশোনা ছাড়তে চান না।
তার একমাত্র স্বপ্ন মায়ের কষ্ট লাঘব করা এবং মানুষের মতো মানুষ হওয়া।
গাবুরা গ্রামের জামিলা, তারও রয়েছে অপরিমেয় জীবন সংগ্রাম। জানিয়েছেন তিনি সে কথা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
তিনি বলেন, আমার পরিবারে আগে খাবারের তেমন কোন অভাব ছিল না। ছোট বেলায় ঘরে মাংস, দুধ, ঘি সবই ছিল। এখন সব কিছুই কিনে খাওয়া লাগে। সাথে নিজের ও স্বামীর চিকিৎসা খরচের ঘানি টানতে হচ্ছে।
জামিলা বলেন, ‘এই সংসারের সবকিছুর দায়িত্ব আমার। আগে স্বামী কাম করত, এখন তিনি অসুস্থ। আমি না কামাইলে ঘরে ভাত উঠবে না। দোকান করি, সেলাই করি, ছিট কাপড় আর জুতা বিক্রি করি। ছেলে এখন বড় হইছে, সেও একটু আয় করে। কিন্তু সংসারের হিসাবটা আমার হাতেই। আগে ভাবতাম পুরুষ মানুষই সব চালায়, এখন বুঝি সময় বদলাইছে, না দাঁড়াইলে সংসার ভাঙে।’
লবণাক্ততার কারণে তার জরায়ুতে টিউমার হয়। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তার জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি সাত-আট বছর রক্ত ভাঙার সমস্যায় ভুগছি।
শেষে ডাক্তারে বলল জরায়ুতে টিউমার, অপারেশন ছাড়া উপায় নাই। অপারেশন করতে ৪০ হাজার টাকা খরচ হইছে, সাত ব্যাগ রক্ত লাগছে। স্বামীর কোনো সাহায্য পাই নাই। ছেলে আর আমার নিজের ব্যবসার টাকায় অপারেশন করেছি। অপারেশনের আগের দিন আমি প্রায় মরার মতো ছিলাম।’
তবে স্বামী থাকার পরও সংসার নেই জামিলার। তার নিজের উপার্জন দিয়ে তিনি নিজেই চলতে পারছে না উল্লেখ করেন। স্বামীর কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি অসুস্থ মানুষ। কাজ করতে পারেন না ঠিকমতো।
শ্যামনগরে থাকে, টুকটাক ব্যবসা করেন। আমি একা কামাই করি, ওই লোককে পুষবো কেমনে? তাই আলাদা থাকি। ডিভোর্স হয় নাই, কিন্তু সম্পর্ক নাই অনেক বছর। সংসার চালাইতে গেলে আবেগে বসে থাকলে হয় না।’
জামিলা বলেন, ‘এখানে আগের মতো আর কিছু নাই। জমি নাই, পুকুর নাই। সব কিছু কিনে খাইতে হয়।
আগে আব্বার আমলের সময় এই এলাকায় অভাব ছিল না। এখন লবণ পানি, কাজের অভাব, সব মিলায়া মানুষ টিকতেই পারতেছে না। শরীর খারাপ থাকলেও কাজ থামানো যায় না, কারণ থামলে খাওয়া বন্ধ।’
ময়না গ্রামের কেয়ার জীবনের গল্পও অনেকটা একই রকম। তার দুই সন্তানের জন্মের সময় দুইবার সিজার করতে হয়েছে। একবার অ্যাপেন্ডিক্স ও জরায়ুর অপারেশনসহ মোট চারবার সার্জারি করতে হয়েছে। ঋণের কিস্তি দিতে দিতেই তার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। এদিকে তার স্বামী থাকলেও স্বামীর আয় না থাকায় পরিবারের সকল দায়িত্ব এখন কেয়ার কাঁধে।
কেয়া বলেন, ‘আমার স্বামী দিনমজুর। মাসে খুব বেশি টাকা পায় না। এই ইনকামে ঘর চালানো খুব কঠিন।
আমার চিকিৎসা, ছেলেমেয়ের খরচ, ঋণের কিস্তি - সব মিলিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাই। আমি অসুস্থ মানুষ, তবুও সংসারের হিসাবটা আমার মাথাতেই ঘোরে। না ভাবলে তো চলেই না।’
তিনি বলেন, ‘খাওয়ার পানির জন্য আমাকে এক কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হয়। কলস কাঁধে করে আনি। এই পানি শুধু খাওয়ার জন্য রাখি। রান্না, গোসল, বাথরুম - সব জায়গায় লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে হয়। পানির এই কষ্টটা মেয়েদের উপর দিয়েই যায়।’
শরীর খারাপ থাকলেও কাজের চিন্তা মাথা থেকে যায় না উল্লেখ করে কেয়া বলেন, ‘এখানে কাজের কোনো ঠিক নাই। নদীর পানি বাড়ে, লবণাক্ততার সমস্যাও বাড়ে। তখন কাজ কমে যায়। শুধু স্বামীর আয়ের ওপর ভর করে সংসার চালানো যায় না। এখন সংসারে কী আগে হবে, কী পরে হবে - এই সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হয়।
আগে এসব চিন্তা করতাম না। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, আমাকে না ভাবলে সংসারই চলবে না।’
শ্যামনগরের উপজেলা নারী উন্নয়ন বিষয়ক কর্মকর্তা শারিদ বিন শফিক এই এলাকার মানুষের জীবনযাপনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নানা প্রভাবে তাদের সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই এলাকার মানুষের সমাজ, পরিবার, স্বাস্থ্য, আয়সহ নানান ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ঘন ঘন মাইগ্রেশনের কারণে এ এলাকার পরিবার ব্যবস্থা অন্য এলাকার চেয়ে ভিন্ন।
তালাক ও স্বামী পরিত্যক্তার হার অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। পুরুষরা কাজের জন্য অন্য এলাকায় যাওয়ায় পরিবারের প্রায় সকল কিছু নারীদের সামলাতে হয়।
এখানে শীতকালে কাজ না থাকায় পুরুষরা অন্য এলাকায় কাজের জন্য চলে যায়। এসময়টিতে নারীদের পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়। কারণ পুকুর, জলাশয়গুলো শুকিয়ে যায়। এই সময়ে নারীদের বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে কষ্ট বেশি হয় বলে জানান তিনি।
এই এলাকায় ৩০ টির বেশি এনজিও তাদের বিভিন্ন প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। সরকারি বিভিন্ন খাতের নিয়মিত বরাদ্দ রাখা হয় বলে জানান এই কর্মকর্তা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসান শাফী এই এলাকার মানুষ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগরে আমার দীর্ঘদিনের গবেষণা থেকে দেখেছি যে আমরা এখানে শুধু নারীদের ব্যক্তিগত সহনশীলতা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের চাপের কারণে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গভীর রূপান্তর প্রত্যক্ষ করছি। লবণাক্ততা, জীবিকা সংকট ও ঘন ঘন দুর্যোগের ফলে পুরুষদের বড় একটি অংশ কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, আর এর ফলে বাস্তবে পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব নারীদের কাঁধে এসে পড়ছে। গাবুরার বহু পরিবারে নারীরাই এখন আয়, সন্তান লালন-পালন, পানি সংগ্রহ এবং অসুস্থ স্বজনের দেখভাল ইত্যাদি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। অথচ জমির অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তারা সবচেয়ে অবহেলিত। এর ফলে এক ধরনের ‘অদৃশ্য নেতৃত্ব’ তৈরি হচ্ছে, যেখানে নারীরা পরিবার ও সমাজ টিকিয়ে রাখছেন, এবং শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সবচেয়ে বেশি বহন করছেন।
এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে জলবায়ু পরিবর্তন এখানে শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, বরং একটি গভীর লিঙ্গভিত্তিক স্বাস্থ্য ও ন্যায়ের সংকট। সরকারের অভিযোজন পরিকল্পনা, সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যনীতিতে যদি শ্যামনগরের নারীদের এই বাস্তব ঝুঁকিকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিবেচনা না করা হয়, তাহলে জলবায়ু অভিযোজন কার্যকর হবে না এবং বিদ্যমান বৈষম্য আরও গভীর হবে।