শিরোনাম

\ নুসরাত সুপ্তি\
নারায়ণগঞ্জ, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : দশটি চুলায় দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। প্রতিটি চুলায় প্রস্তুত হচ্ছে হরেক রকমের বাহারি পিঠা। শীতের পড়ন্ত বিকেল থেকে প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত চলে পিঠা তৈরির মহাযজ্ঞ। পিঠাওয়ালি লতা একের পর এক পিঠা বানিয়ে চলছেন। তার যেন দম ফেলানোর ফুরসত নেই।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ঢাকেশ্বরী ২ নম্বর বাস স্ট্যান্ড এলাকায় আশালতা তার স্বামী মনিন্দ্র বৈরাগীকে নিয়ে পিঠা বিক্রি করেন। প্রতিদিন প্রায় হাজার খানেক পিঠা তৈরি করেন লতা। তার মজাদার স্বাদের এই পিঠা খেতে ভিড় করেন ক্রেতারা, কেউবা অর্ডার দিয়ে বাড়ি চলে যান। নির্দিষ্ট সময় পরে এসে পিঠা নিয়ে যান।
তিনি জানান, প্রতিদিন পিঠা তৈরিতে ৪০-৫০ কেজি পর্যন্ত চালের গুড়ার প্রয়োজন হয়। পিঠা ভেদে প্রতিটি পিঠার দাম ১০-৪০ টাকা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দশ হাজার টাকার পিঠা বিক্রি করেন। খরচ বাদ দিয়ে বেশ লাভ থাকে আশালতার।
লতা জানান, গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়া এলাকার নিবাসী তিনি। স্বামী মনিন্দ্র বৈরাগী ও তার দুই সন্তান বলোরাম, মনিকৃষ্ণকে নিয়ে সেখানেই জীবনের বড় একটা সময় অতিবাহিত করছেন। কিন্তু সংসারের চাহিদার টানে এক সময় চলে আসেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। পরে সেখানে দুই চুলা নিয়ে একটি পিঠার দোকান দেন। সেই থেকে পথ চলা শুরু, যা পরবর্তীতে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেয়।
নিজের নামের শেষে পিঠাওয়ালি যুক্ত হওয়ার গল্পটা জানিয়ে লতা বলেন, দুই পোলার মা, ঘরের বউ এই পরিচয়েই আমারে সবাই চিনত। স্বামী ডিমের ব্যবসা করতো, আমি ঘর সামলাইতাম। কিন্তু করোনার পরে যখন ওনার ব্যবসা বন্ধ হয়ে পড়ে, তখন ঘরে না খাইয়া থাকার অবস্থা হয়। একদিন বাসায় পিঠা বানাইলে সবাই কয়, আমার হাতের পিঠা অনেক মজাই হয়। তখনই পিঠা বেঁচার বুদ্ধি দেয় আমার জামাই। এরপর নিজের দেশের বাড়ি ছাইড়া, নারায়ণগঞ্জ আইসা পিঠা বেঁচা শুরু করি। এহন এই এলাকার মানুষ আমার পিঠা পছন্দ করে আমারে কয়, পিঠাওয়ালি লতা।
সিদ্ধিরগঞ্জের নিবাসী মানিক মিয়া বলেন, লতার পিঠা এখানে নামকরা। চিতই পিঠার সঙ্গে কয়েক রকমের ঝাল ভর্তা। আশেপাশে অনেক দোকান থাকলেও তার পিঠার স্বাদই আলাদা। তার পিঠা খাওয়ার জন্য অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়। সারাদিনের কাজ-কাম শেষ করে তার পিঠা খাইয়া বাড়ি ফিরি।
নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ থেকে বন্ধুদের নিয়ে পিঠা খেতে এসেছেন রানা। পিঠার স্বাদের প্রশংসা করে বলেন, এখানের পিঠার স্বাদ অনেক মজার। এক কথায় দারুন। এ জন্য প্রায়ই শহর থেকে এখানে আসি পিঠা খেতে। ওনাদের ডিম চিতই পিঠার চাহিদা প্রচুর। আমি আজকে অর্ডার দেওয়ার ঘণ্টা খানেক পরে আমার পিঠা পাইছি।
আশা লতা ক্রেতাদের সন্তষ্টি দেখে নিজের তৃপ্তির কথা জানিয়ে বলেন, শীত নাই, গরম নাই, সারা বছরই এখানে পিঠা বিক্রি করি। গরমের তুলনায় শীতে বিক্রির পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়ে। খাটনিটাও অনেক। মানুষে বলে, ‘লতার পিঠা মজা’ এটা শুনতেই খুশি লাগে।
লতাকে সহায়তা করেন তার স্বামী মনিন্দ্র বৈরাগী ও তার ছেলে বলোরাম।
লতার ছেলে বলোরাম বলেন, আব্বা- আম্মার বয়স হয়ে গেছে। শীতের সময়ে পিঠার চাহিদা এতো থাকে, ওনারা সামলাইতে পারে না। প্রতিদিন কয়েকশ পিঠার অর্ডার দিয়ে যায় গ্রাহকেরা। আমি গাড়ির ড্রাইবার হিসেবে কাজ করতাম। শীতের মৌসুমের পরে আবার আমার কাজ শুরু করবো। আব্বার ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পরে আমাদের সংসারের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে, কিন্তু এই পিঠা বিক্রি করে আমাদের জীবনে স্বচ্ছলতা ফিরেছে।