শিরোনাম

\ এনামুল হক এনা \
পটুয়াখালী, ৬ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : পটুয়াখালীতে দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সূর্যমুখি চাষ। ভোজ্যতেল উৎপাদনের পাশাপাশি পশুখাদ্য, পাখির খাদ্য, জৈবসার, প্রসাধনী উপাদান এবং সৌন্দর্য বর্ধনকারী ফুল হিসেবে সূর্যমুখির বহুমুখী ব্যবহার বাড়ায় এই ফসলকে ঘিরে কৃষক ও সাধারণ মানুষের আগ্রহও বেড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় সূর্যমুখি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৩৩ হেক্টর। তবে কৃষকদের আগ্রহে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৩ হাজার ৫১২ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, সূর্যমুখির বীজ থেকে উন্নতমানের ভোজ্যতেল উৎপাদন হয়। তেল নিষ্কাশনের পর খৈল গবাদি পশুর পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুকনো কান্ড ও পাতা জৈবসার তৈরিতে কাজে লাগে। অনেক এলাকায় সূর্যমুখির ফুল পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার সাতানি গ্রামের কৃষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ধানের তুলনায় সূর্যমুখিতে খরচ কম, রোগবালাইও কম। ফলন ভালো হলে লাভও বেশি। তেলের জন্য বাজারে চাহিদা আছে, আবার খৈলও বিক্রি করা যায়।’
বাউফল উপজেলার মদনপুরা গ্রামের কৃষক মেহেদি হাসান বাসস’কে বলেন, ‘আগে শুধু ফুলের জন্য মানুষ সূর্যমুখি চিনত। এখন তেল, বীজ আর গবাদি পশুর খাদ্য-সব মিলিয়ে এটা লাভজনক ফসল। আমরা চাই স্থানীয়ভাবে তেল প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা বাড়ুক।’
এদিকে সূর্যমুখির হলুদে মোড়া মাঠ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কৃষি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে এসব ক্ষেত এখন স্থানীয় পর্যটনেরও আকর্ষণ।
বরিশাল থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘সূর্যমুখির মাঠ খুবই দৃষ্টিনন্দন। ছবি তোলার পাশাপাশি জানতে পারলাম, এই ফুল শুধু সৌন্দর্যের নয়-এটা থেকে তেল, পশুখাদ্য ও আরও অনেক কিছু হয়। বিষয়টি সত্যিই চমৎকার।’
বাউফল পৌর শহরের দর্শনার্থী আল রাফি বাসস’কে বলেন, ‘এ ধরনের ক্ষেত শুধু কৃষকের আয় বাড়ায় না, মানুষকে প্রকৃতির কাছেও টানে। যদি পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা যায়, তাহলে এটি কৃষি-ভিত্তিক পর্যটনের বড় সম্ভাবনা হতে পারে।’
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সূর্যমুখির বহুজাত ব্যবহার, স্বাস্থ্যসম্মত তেলের চাহিদা এবং তুলনামূলক কম খরচে আবাদ সম্ভব হওয়ায় আগামীতে এই ফসলের চাষ আরও বাড়বে। স্থানীয়ভাবে তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো গেলে পটুয়াখালীতে সূর্যমুখি হতে পারে কৃষকের নতুন সম্ভাবনার নাম।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আমানুল ইসলাম বাসস’কে জানান, “চলতি মৌসুমে সূর্যমুখি আবাদরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৩৩৩ হেক্টর। আর আবাদ হয়েছে ৩৫১২ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার চাইতে অনেক বেড়েছে আবাদ। এটি আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক দিক। কৃষকরা এখন সূর্যমুখিকে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে দেখছেন।’
তিনি বলেন, ‘এটি দিনদিন পপুলার হচ্ছে। মানুষের খাদ্য তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। সূর্যমুখির তেল স্বাস্থ্যসম্মত এবং পুষ্টিগুণসম্পন্ন হওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে এর চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষকরাও বুঝতে পারছেন, এটি শুধু একটি ফুল নয়-এটি একটি বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য ফসল। বীজ থেকে উন্নতমানের ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। তেল নিষ্কাশনের পর যে খৈল থাকে তা গবাদিপশুর পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া শুকনো কান্ড ও পাতা জৈবসার তৈরিতে কাজে লাগে।’
ড. আমানুল ইসলাম আরও বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জমি রয়েছে যেখানে রবি মৌসুমে বিকল্প ফসল চাষের সুযোগ আছে। সেখানে সূর্যমুখি খুব ভালোভাবে মানিয়ে নিচ্ছে। তুলনামূলকভাবে এর উৎপাদন খরচ কম, রোগবালাইও কম হয় এবং সঠিক পরিচর্যা করলে কৃষক ভালো ফলন পান। এই কারণে দিনদিন কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি সূর্যমুখির দৃষ্টিনন্দন ফুল দেখতে মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসছেন, যা গ্রামীণ পর্যটনেরও একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।’