শিরোনাম

\ রুস্তম আলী মন্ডল \
দিনাজপুর, ২৬ মে,২০২৬ (বাসস): দিনাজপুর সদর উপজেলার পল্লীতে রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষ পদ্ধতি ভোক্তাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছাড়াই বিশেষ এক পদ্ধতিতে জৈব সারের ব্যবহার এবং পোকা দমনে প্রয়োগ করা হচ্ছে ফেরোমন ফাঁদ। এতে স্বল্প শ্রম, কম খরচ করে দ্বিগুণ সবজির ফসল উৎপাদনে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। এছাড়া বাজারে এ ধরণের বিষমুক্ত সবজি পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন ক্রেতারা।
এমন বিষমুক্ত সবজি চাষে সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন জেলার সদর উপজেলার আস্করপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা। কৃষকদের বিষমুক্ত সবজি চাষে বাস্তবে রূপ দিয়েছে দিনাজপুর বেসরকারি সাহায্য সংস্থা- মহিলা বহুমূখী শিক্ষা কেন্দ্র-এমবিএসকে কৃষি শাখা। এ ধরনের কৃষি কাজে কৃষকদের মাঠে সাফল্য অর্জন করতে সহযোগিতা করেছেন, পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন-পিকেএসএফ।
এমবিএসকে কৃষি শাখার কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাইমুর রহমান বাসস’কে জানান, দিনাজপুর সদর উপজেলার কৃষকদের নিরাপদ সবজি চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ ধরণের নিরাপদ সবজি চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কৃষক এবং ভোক্তা উভয়ের নিকট। নিরাপদ উচ্চ মূল্যের সবজি চাষের নানা পদ্ধতি ব্যবহারে কৃষকরা সফলতা অর্জনে অধিক মূল্যে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে সক্ষম হচ্ছে। কৃষকরা এ পদ্ধতি ব্যবহারে জমিতে অর্জিত সবজির ভাল ফলন পাচ্ছেন। বাজারে আগত ক্রেতারা পাচ্ছেন বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি। এখন বিষমুক্ত চাষ করা সবজির চাহিদা ভোক্তাদের কাছে অনেকটাই চাহিদা বাড়ছে।
গতকাল সোমবার সরেজমিনে জেলার সদর উপজেলার ৯নং আস্করপুর ইউনিয়নের নুনিয়াগাড়ী গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকরা নিরাপদ ও উন্নত মানের বিষমুক্ত সবজি আবাদে ব্যবহার করেছেন নতুন এসব পদ্ধতি। করলা, পটল, চিচিঙ্গা, কায়তা, মরিচ, বেগুন, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি ফসলের আবাদ মাঠজুড়ে অত্যন্ত পরিপাটি এবং ফসলের ক্ষেতগুলোতে বসানো হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ। এতে দমন করা হচ্ছে ক্ষেতের ক্ষতিকর পোকার উপদ্রব। জমিতে ব্যবহার করা হচ্ছে জৈব সার ও নিমের রস।
এমবিএস’কে কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা মো. জুবায়ের রনি বাসস’কে জানান, ক্ষেতে সার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে জৈব সার ও নিমের রস। এরফলে ওই জমিতে সার প্রয়োগ কম করতে হয়। সেচের অপচয় হয় না এবং ক্ষতিকর পোকা আক্রমণ করতে পারে না। সবজি ক্ষেতগুলোতে বসানো হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ। এতে ছত্রাক কিংবা বিভিন্ন রোগের আক্রমণ কম হয়। সর্বোপরি মান-সম্পন্ন ও ভাল ফলন উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। তাই কৃষকদের উৎসাহিত করে এসব পদ্ধতি ব্যবহারে সবজি চাষ করানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ওই কৃষি কর্মকর্তা জানান, এই পদ্ধতিতে নিরাপদ সবজি উৎপাদনে কৃষকের খরচও কমে হচ্ছে। সদর উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামের কৃষক মো. সায়েদ আলী বলেন, তিনি এবারে ৩০ শতক জমিতে এই পদ্ধতি ব্যবহারে ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে করলা ও দেশি জাতের পটল আবাদ করেছেন। তার ওই সবজির ক্ষেত থেকে এখন পযন্ত খরচ বাদে ৬০ হাজার টাকা অর্জিত হয়েছে। অর্জিত ক্ষেত থেকে আগামী এক থেকে দেড় মাস আরও সবজি বিক্রি করতে পারবেন। সেখান থেকে তার আরও মুনাফা আসবে বলে তিনি জানান।
ফেরোমন ফাঁদ নিয়ে ওই কৃষি কর্মকর্তা জানান, ক্ষতিকর ঔষধ স্প্রে না করে,এটি হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব কীট-পতঙ্গ দমন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে প্লাস্টিকের বক্স ব্যবহার করা হয়। যার দু’পাশে তিন কোণা ফাঁক থাকে। পুরুষ পোকাকে আকৃষ্ট করতে স্ত্রী পোকার শরীর থেকে নিঃসৃত এক রকম রাসায়নিক পদার্থ বা স্ত্রী পোকার গন্ধ ব্যবহার করা হয় ফাঁদে। এর আকর্ষণে পুরুষ পোকা ফাঁদের দিকে ধেয়ে আসে এবং ফাঁদে পড়ে মারা যায়। এতে করে জমির ফসল নিরাপদ থাকে।
সদর উপজেলার নাগোরপাড়া গ্রামের কৃষক মো. আব্দুর রহমান, মাহবুব হোসেন, সহিদুল ইসলাম, বীরেন চন্দ্র, শেফালি রাণীসহ অনেকেই বাসস’কে জানান, এই পদ্ধতিতে ব্যবহারে করলা, পটল, চিচিঙ্গাসহ নানা সবজি আবাদ করেছেন। ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করায় জমির ফসল নিরাপদ থাকছে। পোকার আক্রমণের হাত থেকে রক্ষায় এটি একটি কার্যকর পদ্ধতি। এছাড়া রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে জৈব সার ও কেঁচো সার। ফসলের জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই প্রয়োগ করা হচ্ছে, নিমের নির্যাস দিয়ে তৈরি রস। এতে ফলন উৎপাদন অনেকাংশে বেড়ে গেছে। যা দেখে আশে পাশের কৃষকরা এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারে ফসল উৎপাদনে উৎসাহ পাচ্ছেন।
মহিলা বহুমূখী শিক্ষা কেন্দ্র-এমবিএসকে-কৃষি কর্মকর্তা জোবায়ের রনি বাসস’কে জানান, দিনাজপুরে প্রান্তিক কৃষকদের সংগঠিত করে জৈবিক পদ্ধতি ব্যবহার করে নিরাপদ উচ্চ মূল্যের সবজি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে হাতেুকলমে কৃষকদেরকে নানা প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। দিনাজপুর সদর উপজেলায় নিরাপদ উচ্চ মূল্যের সবজি উৎপাদনে নানা পদ্ধতি ব্যবহার বেড়েছে। নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সুফল বুঝতে পেরে কৃষকরা সহজেই এই পদ্ধতি ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে। অপর দিকে ক্রেতারা নিরাপদ সবজি পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন। আগামীতে এই পদ্ধতি ব্যবহারে আরও অধিক সবজি চাষ কৃষকরা করবেন এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বাসস’কে বলেন, কয়েকটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থা, রাসানিক সার ও বিষমুক্ত সবজি চাষে জেলার বেশ কয়টি উপজেলায় কৃষকদের নিয়ে কাজ করছেন। তিনি এসব সবজির ক্ষেত পরিদর্শন করেছেন। তাদের কৃষি ক্ষেত্রে এ ধরনের সহযোগিতার জন্য সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।