শিরোনাম

একেএম রাশেদ শাহরিয়ার
ঢাকা, ০৫ জুন, ২০২৬ (বাসস) : দেশের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও ডিজিটাল কনটেন্ট খাতের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে বাড়ছে দক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্ত জনবলের চাহিদা। এ চাহিদা পূরণে যুবসমাজ ও সৃজনশীল মানুষদের দক্ষ নির্মাতা, কলাকুশলী ও ফ্রিল্যান্সার হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (বিসিটিআই)।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছয়টি বিশেষ স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে। সময়োপযোগী এসব কোর্স বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং তা দেশের বিনোদন ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বিসিটিআই-এর প্রধান নির্বাহী (চলতি দায়িত্ব) আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বাসস’কে বলেন, দেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার বিকল্প নেই।
বিসিটিআই এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে একঝাঁক তরুণ ও প্রতিভাবান দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এবারের ছয়টি বিশেষ কোর্স অত্যন্ত সময়োপযোগী করে সাজানো হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ওটিটি’র চাহিদা বিবেচনায় ‘কনটেন্ট নির্মাণ’ কোর্স এবং কর্মজীবীদের সুবিধার্থে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ‘প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ’ কোর্স চালু করা হয়েছে। আমরা শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষা দিচ্ছি না, আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দিচ্ছি। ফলে কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে সহজেই প্রবেশ করতে পারছে।’
খাত-সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দক্ষ জনবল তৈরিতে কাজ করলেও চাহিদার তুলনায় তা এখনও অপ্রতুল। আবার চার বা পাঁচ বছর মেয়াদি ডিগ্রি অর্জন করাও সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দেশের মিডিয়া শিল্পে দক্ষ জনবলের ঘাটতি ছিল। বেশিরভাগ মানুষই অনানুষ্ঠানিকভাবে বা ‘ওস্তাদ-শাগরেদ’ পদ্ধতিতে কাজ শিখতেন।
বিসিটিআই-এর এসব বিশেষ কোর্স সেই শূন্যতা অনেকটাই পূরণ করছে।
চিত্রনাট্য লিখন, সম্পাদনা (এডিটিং) ও অভিনয়ের মতো বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা তরুণদের বিশ্ববাজারের উপযোগী করে তুলছে।
বিসিটিআই-এর কোর্সগুলোর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় সংযোজন ‘টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট নির্মাণ’ কোর্স। বর্তমান যুগ ওটিটি, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক কনটেন্টের যুগ।
সনাতনী টেলিভিশন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য কীভাবে মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করতে হয় এবং তা থেকে আয় করা যায়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এতে আত্মকর্মসংস্থান ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগও বাড়ছে।
অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়েও যারা চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র নির্মাণে আগ্রহী, তাদের জন্য বিসিটিআই চালু করেছে ‘ষষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ কোর্স’। কোর্সটির বিশেষত্ব এর সময়সূচি। প্রতি শুক্র ও শনিবার দিনব্যাপী এবং সপ্তাহের একদিন সান্ধ্যকালীন ক্লাস থাকায় চাকরিজীবী, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা কর্মদিবস নষ্ট না করেই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মতো সৃজনশীল ও জটিল বিষয় আয়ত্ত করতে পারছেন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলচ্চিত্র বা ভিডিও এডিটিংয়ের কোর্সগুলো যেখানে অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সেখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিসিটিআই মাত্র ছয় থেকে আট হাজার টাকায় উচ্চমানের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী তরুণ-তরুণীরাও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এই কোর্সগুলোর সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো বয়সসীমা নেই। ন্যূনতম এইচএসসি পাস যে কেউ, যেকোনো বয়সে নিজের সৃজনশীল প্রতিভাকে ঝালিয়ে নিতে পারছেন। অনেক সাংবাদিক, লেখক ও ব্যাংকারও পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে বা ব্যক্তিগত শখের আগ্রহ থেকে এসব কোর্সে অংশ নিচ্ছেন।
বিসিটিআই থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা শুধু টেলিভিশন চ্যানেল বা চলচ্চিত্রে নয়, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব ও ফেসবুকের জন্য স্বাধীন কনটেন্ট নির্মাতা হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। এডিটিং ও স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ে দক্ষ তরুণদের জন্য আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস যেমন- আপওয়ার্ক ও ফাইভারেও রয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ।
বিসিটিআই-এর সহকারী পরিচালক (রেজিস্ট্রেশন) জান্নাতুল ফেরদৌস বাসস’কে বলেন, দেশের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের সামগ্রিক মানোন্নয়ন এবং একটি দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে বিসিটিআই-এর বিশেষ কোর্সগুলো নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করছে।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন অবকাঠামো ও স্থায়ী জনবল নিশ্চিত করা গেলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ ও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
বিসিটিআই-এর প্রধান নির্বাহী আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, নামমাত্র ফি-তে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে বিসিটিআই। বয়সসীমা না থাকায় যেকোনো বয়সী সৃজনশীল মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে। তিনি দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ ও গণমাধ্যমকর্মীদের এ সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বাসস’কে বলেন, দেশের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল মাধ্যমগুলোর গুণগত মানোন্নয়নে দক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্ত জনবল তৈরি সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যেই বিসিটিআই আধুনিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগ্রহী ব্যক্তিদের দক্ষ করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীলতার যুগ। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বিস্তারের ফলে যেমন কনটেন্টের চাহিদা বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতাও। বিসিটিআই পরিচালিত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, অভিনয়, সম্পাদনা, চিত্রনাট্য লিখন ও কনটেন্ট নির্মাণের কোর্সগুলো তরুণদের শুধু দক্ষই করছে না, বরং স্বাবলম্বী ও পেশাদার ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও গড়ে তুলছে।
ইয়াসের খান চৌধুরী আরও বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত এসব কোর্স পরিচালিত হওয়ায়ক দেশের মধ্যবিত্ত ও সাধারণ পরিবারের প্রতিভাবান শিক্ষার্থীরাও চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যম খাতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে কর্মজীবীদের সুবিধার্থে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ কোর্সের সময়সূচি এবং সব কোর্সে কোনো বয়সসীমা না রাখার সিদ্ধান্ত যুগোপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
তরুণ প্রজন্ম ও গণমাধ্যমকর্মীদের এ সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি, দেশের সৃজনশীল তরুণরা এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলবে এবং আমাদের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করবে।’