শিরোনাম

ঢাকা, ১১ মে ২০২৬ (বাসস): দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। একই সঙ্গে আসন্ন জাতীয় বাজেটে ব্যাংক খাতের জন্য বিভিন্ন কর ও নীতিগত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে আজ সোমবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ নীতি সহায়তা চেয়েছেন বিএবি সভাপতি ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এ কে আজাদ, ইউসিবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহির, পূবালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুরুর রহমান এবং ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে তারা লিখিতভাবে ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূলধন ঘাটতি, করনীতি এবং আর্থিক খাত সংস্কার বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ তুলে ধরেন।
নিজেদের সুপারিশে বিএবি বলেছে, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় অতিক্রম করছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততার চাপ, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, আইনি জটিলতার কারণে ঋণ আদায়ে বিলম্ব, তহবিল ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা ব্যাংক খাতকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বিএবি বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের চলমান সংস্কার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে, কার্যকর ও টেকসই সংস্কারের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংক খাতের মধ্যে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ সংলাপ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করে।
ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো নিয়ে বিএবি বলেছে, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠনে সাবেক মালিকদের সীমিত অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হলে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ যাচাই, ফরেনসিক পর্যালোচনা ও অর্থের উৎস যাচাই নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের আগে ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে ধারাবাহিক পরামর্শেরও আহ্বান জানানো হয়। বিএবি’র মতে, বোর্ড পরিচালনা, স্পন্সর শেয়ার, স্বতন্ত্র পরিচালক কাঠামো, লভ্যাংশ নীতি ও মূলধন সংগ্রহে এ সংশোধনের বড় প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের ইনসেনটিভ বোনাস বিষয়ে বিএবির বক্তব্য হচ্ছে-সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোতে দক্ষ জনবল ধরে রাখতে কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক প্রণোদনা চালু রাখা প্রয়োজন।
এছাড়া খেলাপি ঋণ আদায়, প্রভিশন ঘাটতি কমানো, মুনাফা বৃদ্ধি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এ ধরনের প্রণোদনা যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির এক প্রস্তাবে ২০ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ রয়েছে- এমন ব্যাংকগুলোকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় রাখা, পুনঃতফসিলকৃত ঋণের জন্য শিথিল শ্রেণীকরণ সুবিধা দেওয়া এবং ঝুঁকিভিত্তিক মূলধন চাপ কমানোর কথা বলা হয়েছে।
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি জাতীয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছে বিএবি। তাদের মতে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের শ্রেণীকৃত ঋণ ব্যবস্থাপনা, পুনর্গঠন ও আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া ঋণ আদায়ে বিশেষ আর্থিক আদালত গঠন, দীর্ঘসূত্রিতা কমানো, স্থগিতাদেশ দেওয়ার আগে ব্যাংকের বক্তব্য শোনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর মামলা ব্যবস্থাপনা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএবি। তাদের মতে, সাময়িক লভ্যাংশ সীমাবদ্ধতা বা প্রভিশন ঘাটতির কারণে ব্যাংকগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পাঠানো হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ক্ষেত্রে ‘ট্রান্সফরমেশন ক্যাটাগরি’ বা ‘রেগুলেটরি রিকভারি ক্যাটাগরি’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন বাজেটে ব্যাংক খাতের জন্য করপোরেট করহার ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা, ঋণ ক্ষতি সংরক্ষণকে কর ছাড় যোগ্য ব্যয় হিসেবে গণ্য করা এবং শেয়ার লভ্যাংশের ওপর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বিএবি।
ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মধ্যে পূর্ণ আন্তঃসংযোগ, কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোরও আহ্বান জানিয়েছে বিএবি।
দেশের বাণিজ্য, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, এসএমই অর্থায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি উল্লেখ করে সংস্কার কার্যক্রমে আর্থিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি বাস্তবতা, বাজার আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএবি।