বাসস
  ১৬ আগস্ট ২০২৬, ২১:২৮

পাহাড়ে ‘ম্রো সম্মেলন’, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের নতুন বার্তা

ছবি : বাসস

চট্টগ্রাম, ১৬ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : পার্বত্য বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতায় ইউনিয়নে ব্যতিক্রমী আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ‘ম্রো সম্মেলন-২০২৬’। 

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অংশগ্রহণে দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশে ‘শান্তি, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির নতুন বার্তা ছড়িয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা। এতে ম্রো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন ও স্থানীয় নেতৃত্বের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, যোগাযোগ ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, কমান্ডার ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও বান্দরবান রিজিয়ন এর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, এসপিপি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি।

সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিভিন্ন পাড়া থেকে ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়। প্রতিনিধিরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, কৃষি, নিরাপদ পানি, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণসহ বিভিন্ন সমস্যা, প্রয়োজন ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। রিজিয়ন কমান্ডার তাদের বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনেন এবং বাস্তবসম্মত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বয়ে পর্যায়ক্রমে সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

সম্মেলনে আলীকদম জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আশিকুর রহমান আশিক, এসপিপি, পিএসসি, অধিনায়ক ৫৮ ইবি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কারবারী, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, নারী ও যুব প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন পাড়া থেকে আগত প্রায় ১ হাজার ২০০ জন ম্রো জনগোষ্ঠীর সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

রিজিয়ন কমান্ডার তার বক্তব্যে বলেন, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন শুধু নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়; জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণও এর অপরিহার্য অংশ। পাশাপাশি তিনি ম্রো জনগোষ্ঠীকে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন-জীবিকা পরিচালনা, সন্তানদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। 

তিনি বলেন, ২০১৫ সালে কুরুকপাতার মাটিতে যে শান্তির দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, সেই শান্তির ধারাবাহিকতাকে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করতে হবে। রিজিয়ন কমান্ডার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, বান্দরবান রিজিয়ন ও আলীকদম সেনাজোন জনগণের নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

প্রধান অতিথি বক্তব্যের শুরুতে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ম্রো জনগোষ্ঠীর ইতিবাচক ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। 

তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে কুরুকপাতায় ম্রো ন্যাশনাল পার্টির ৭৯ জন সদস্য অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ম্রো সোশ্যাল কাউন্সিলের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সম্পন্ন হওয়া এ ঘটনা শান্তির পথে ফিরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, ম্রো সমাজের দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, জনগণের সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে। তিনি শান্তির সেই ইতিবাচক ধারাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, ‘শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন তিনটি একই সুতোয় গাঁথা। আলীকদমে ম্রো, মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালিসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এ অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে এ সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে হবে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফল দুর্গম জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের মতবিনিময় ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।