বাসস
  ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৭:০৬

দুই বছরে ঢাকার চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব: ডিএসসিসি প্রশাসক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম আজ ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডুরা) সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন। ছবি : বাসস

ঢাকা, ১২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বলেছেন, নগরবাসী, গণমাধ্যম ও সিটি কর্পোরেশন সম্মিলিতভাবে কাজ করলে আগামী দুই বছরে ঢাকার চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘জনগণের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ, সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ। এই দুই পক্ষের মাঝামাঝি অবস্থানে গণমাধ্যম। তাই সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’

আজ বুধবার ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডুরা) সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ডিএসসিসি প্রশাসক এসব কথা বলেন।

প্রশাসক বলেন, ঢাকা শহরের সমস্যা গণমাধ্যমে তুলে ধরার কারণে সিটি কর্পোরেশন দ্রুত তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে। তিনি সমালোচনাকে নেতিবাচকভাবে দেখেন না উল্লেখ করে বলেন, কোথাও আবর্জনা পড়ে থাকা, সড়কের বাতি না জ্বলা কিংবা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তা তার নজরে আসে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আব্দুস সালাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় সিটি কর্পোরেশন অনেকটা ‘নির্জীব’ অবস্থায় ছিল। একটি দৈনন্দিন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে আবার কর্মক্ষম অবস্থায় ফিরিয়ে আনা ছিল তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখনো কিছু জটিলতা রয়েছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাজ চলছে।

রাজস্ব আদায়ে অগ্রগতির কথা তুলে ধরে প্রশাসক বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজস্ব আদায় বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সাম্প্রতিক কয়েক মাসে আগের তুলনায় সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন যাতে নিজস্ব রাজস্ব দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে।

তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন রাস্তা নির্মাণ ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ বিভিন্ন কাজ করলেও এসব খাত থেকে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ সিটি কর্পোরেশনের কাছে আসে না। মোবাইল কোর্টের জরিমানার অর্থ সরকারি রাজস্ব তহবিলে জমা হয়, অথচ অভিযান পরিচালনায় সিটি কর্পোরেশনের ব্যয় রয়েছে। এসব বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে রাজস্ব বৃদ্ধির নতুন ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত পথ না থাকায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, ঢাকা কলেজ ও গ্রিন রোড এলাকার পানি নিষ্কাশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এটি পুনরায় কার্যকর করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুদানও পাওয়া গেছে।

আব্দুস সালাম বলেন, পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুনর্গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাৎক্ষণিকভাবে জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় সিটি কর্পোরেশন পাম্প কিনেছে। ফলে আগে যেখানে কয়েক দিন পানি জমে থাকত, এখন অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে।

পুরান ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল উল্লেখ করে প্রশাসক বলেন, ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের অনেক ড্রেন দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। অনেক ড্রেন মাটি, বালু ও বিভিন্ন বর্জ্যে ভরে গেছে। ড্রেন ও খাল পরিষ্কারের কাজ চললেও বর্ষাকালে বড় ধরনের খননকাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

জলাবদ্ধতার জন্য নাগরিকদের অসচেতনতাকেও দায়ী করে তিনি বলেন, পলিথিন, ককশিট, পুরোনো কাপড়, এমনকি বালিশ ও ম্যাট্রেসও ড্রেনে পাওয়া যাচ্ছে। একটি পলিথিন বা বড় কোনো বর্জ্য ড্রেনে আটকে একটি পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যাহত করতে পারে। তাই সিটি কর্পোরেশনের সমালোচনার পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

প্রশাসক বলেন, সকালে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা পরিষ্কার করার পরও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন মার্কেট ও ফুটপাত আবার বর্জ্যে ভরে যায়। ব্যবসায়ীদের দোকানের সামনে বিন বা বালতি রাখার আহ্বান জানানো হলেও অনেকেই তা মানছেন না।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর কারণে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দক্ষিণ সিটি এলাকায় পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকলে মশার লার্ভা জন্মাতে পারে না। ব্যক্তিগত ও বেসরকারি স্থাপনার অভ্যন্তরে জমে থাকা পানি অপসারণে সংশ্লিষ্টদের নিজ দায়িত্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে সিটি কর্পোরেশন সহযোগিতা করবে।

রিকশা ও হকার ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে প্রশাসক বলেন, ঢাকার রিকশাগুলোকে অঞ্চলভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একটি এলাকার রিকশা অন্য এলাকায় গিয়ে চলাচল করতে পারবে না। রিকশার লাইসেন্স ও নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক চলাচলের ব্যবস্থা করা হবে।

হকারদের জন্যও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র ছাড়া কেউ হকারি করতে পারবেন না। বড় ফুটপাতের নির্দিষ্ট অংশে প্রয়োজন অনুযায়ী হকারদের বসার সুযোগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি শুক্রবার ও শনিবার হলিডে মার্কেট এবং অফিস সময়ের পর মতিঝিলে নাইট মার্কেট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব স্থানে টয়লেট, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। এর বিনিময়ে নিবন্ধন ও মাসিক ফি নেওয়া হবে।

গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায়ও শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যত্রতত্র বাস থামানো ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করে নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ চলছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, ঢাকার বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের সমন্বয় করা হচ্ছে, যা সিটি কর্পোরেশনের জন্য সহায়ক হচ্ছে।

বর্ষাকালে সড়ক কাটাকাটি নিয়েও সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থা সড়ক কাটলেও দায় ও সমালোচনা শেষ পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশনের ওপর আসে। এ কারণে সমন্বিতভাবে এসব কাজ পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রশাসক বলেন, আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হলে তিনি আর দায়িত্বে থাকবেন না। বর্তমানে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা, মশা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো দৈনন্দিন সমস্যাগুলো সমাধান করা যেমন জরুরি, তেমনি ট্রেড লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধনের মতো নাগরিক সেবা দ্রুত নিশ্চিত করাও তার অন্যতম চ্যালেঞ্জ। এক দিনের মধ্যে ট্রেড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন এবং দ্রুত জন্মনিবন্ধন সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নাগরিক অভিযোগ দ্রুত সমাধানে অ্যাপ ব্যবহারের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কোথাও আবর্জনা পড়ে থাকলে কিংবা কোনো স্ট্রিট লাইট নষ্ট থাকলে অ্যাপের মাধ্যমে ছবি পাঠালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

নতুন যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডের অবকাঠামোগত ঘাটতির কথা উল্লেখ করে প্রশাসক বলেন, এসব এলাকায় অনেক জায়গায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রাস্তা ও বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। এগুলো নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সরকারের কাছে থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, পুরান ঢাকার সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকিসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ঢাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে।

প্রশাসক বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ যদি আমাকে দুই বছর সময় দেন এবং জনগণ আমাকে সমর্থন করেন, তাহলে জনগণ ও গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে দুই বছরে ঢাকার চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব।’

তিনি সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘ঢাকার সমস্যা একা প্রশাসকের নয়, একা প্রধানমন্ত্রীরও নয়-এটি আমাদের সবার সমস্যা। এই নগরকে সুন্দর করতে হলে সবাইকে সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডুরা) সভাপতি শাহজাহান মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলামের নেতৃত্বে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।