শিরোনাম

ঢাকা, ১২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনও যোগাযোগ ব্যবস্থা সেভাবে গড়ে না ওঠায় সেখানের জনগোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রে মূল শহর ও জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেক জায়গায় নেই সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা অবকাঠামো। এমন বাস্তবতায় পাহাড়ের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়তে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারে ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে শহরের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কাছ থেকে অনলাইনে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ ও তুলনামূলক কঠিন বিষয় শেখার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশের মূলধারার উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সরকারের এ উদ্যোগ সফল হলে অঞ্চলটি সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
ই-লার্নিং বা ইলেকট্রনিক লার্নিং হলো প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা ব্যক্তির কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের একটি আধুনিক পদ্ধতি। গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী ই-লার্নিংয়ের প্রসার ঘটলেও করোনাভাইরাস মহামারির সময় বাংলাদেশে এর ব্যবহার ও জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
করোনাকালে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে টেলিভিশনের মাধ্যমে ক্লাস পরিচালনার ব্যবস্থাও চালু হয়। এতে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে পড়াশোনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
এবার সেই ডিজিটাল শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলে। একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণসহ নানা ধরনের শিক্ষার সুযোগ তৈরি হচ্ছে ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরাও ধীরে ধীরে শিক্ষার এই পরিবর্তিত পদ্ধতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
পার্বত্যাঞ্চলে ই-লার্নিং বা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। শহরের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মাধ্যমে দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকায় মানসম্মত শিক্ষা এবং ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ পৌঁছে যাওয়ায় তরুণ ও শিক্ষার্থীরা স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছেন। তবে ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা, সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের অভাব এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতির মতো কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও রয়েছে।
ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে পাহাড়ের তরুণরা ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন। একই সঙ্গে সমতল ও পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার ব্যবধান কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ডিজিটাল শিক্ষা। কারণ, কেবল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নয়, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ প্রজন্মই পারে একটি বৈষম্যহীন ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শিক্ষার প্রসারে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে ই-লার্নিং অন্যতম। পাহাড়ের অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট—স্টারলিংক বা সমজাতীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ই-লার্নিংয়ের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অভিজ্ঞ শিক্ষকরা সরাসরি অনলাইনে গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজির মতো বিষয় পড়াতে পারছেন। এতে স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষকের ঘাটতি পূরণেরও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানো প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, সম্পদসমৃদ্ধ এই অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের পাশাপাশি স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং কফি, কাজুবাদাম ও ড্রাগন ফলের মতো উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে।
ই-লার্নিংয়ের আওতায় তিন পার্বত্য জেলায় নির্বাচিত ১২টি বিদ্যালয়ে ডিজিটাল শিক্ষাক্রমের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার তিনটি প্রাথমিক ও নয়টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম চালু করা হয়। পর্যায়ক্রমে দ্রুত সময়ের মধ্যে তিন পার্বত্য জেলার নির্বাচিত মোট ১৪৯টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ই-লার্নিং কার্যক্রম চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মনিরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির ৫৫০টি বিদ্যালয়ে টেলিভিশন ও মাল্টিমিডিয়া সংযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্গম অঞ্চল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকটের কারণে এসব এলাকায় অনেক সময় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ থাকে না। একই কারণে ভালো ও অভিজ্ঞ শিক্ষকরা সেখানে যেতে আগ্রহী হন না। প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষকরা গেলে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয়।
তিনি বলেন, “ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এখন আর একটি নির্দিষ্ট শিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হবে না। শিক্ষক পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, সেখান থেকেই শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারেন। ফলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পুরোপুরিভাবে ই-লার্নিং ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষকের সংকট কাটিয়ে শিক্ষার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।”
ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিখোর সহপ্রতিষ্ঠাতা জিশান জাকারিয়া বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে মানুষের আত্মবিশ্বাসের জায়গা এখনও পুরোপুরি শক্ত হয়নি। এ ধরনের সমস্যা সমাধানে শিখো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। প্ল্যাটফর্মের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়েও তারা সেমিনারের আয়োজন করে থাকে ।আর এসব সেমিনারে ই-লার্নিংয়ের গুরুত্ব ও কার্যকারিতা সম্পর্কে তাদের ধারণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আরও ভালো সেবা দিতে শিখোও নিয়মিতভাবে নিজেদের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও উন্নত করছে।
ই-ক্যাবের অ্যাড-টেক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মনির হোসেন বলেন, ই-লার্নিংয়ের অন্যতম সুবিধা হলো—অভিভাবকেরা চাইলে সন্তানের পড়াশোনার অগ্রগতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। তিনি বলেন, মানুষ এখনও ই-লার্নিংয়ের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। তবে শিক্ষার্থী কত সময় পড়াশোনা করছে, কী পড়ছে এবং তার ফলাফল কেমন হচ্ছে—এসব তথ্য অভিভাবকেরা সহজেই যাচাই করতে পারেন। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবকদের অংশগ্রহণ ও নজরদারির সুযোগও বাড়ছে।
দুর্গম পাহাড়ি জনপদে মানসম্মত শিক্ষা পৌঁছে দিতে ই-লার্নিং তাই শুধু বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা নয়, বরং শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য কমিয়ে একটি দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্ম গড়ে তোলার সম্ভাবনাময় মাধ্যম হয়ে উঠছে। যথাযথ ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিশু ও তরুণদের জন্য এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।