শিরোনাম

ঢাকা, ১১ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): নবজাতকের সুস্থ বিকাশ ও অপুষ্টি প্রতিরোধে জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো, প্রথম ছয় মাস একচেটিয়া বুকের দুধ দেওয়া এবং ছয় মাস পর নিরাপদ ও পুষ্টিকর পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি দুই বছর বা তারও বেশি সময় বুকের দুধ খাওয়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এ আহ্বান জানান।
বিএমইউর নিওন্যাটোলজি বিভাগ, ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগ এবং বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরামের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিল্টন হলে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার। ফিটোম্যাটারনাল মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. তাবাসুস পারভীন ও বাংলাদেশ নিওন্যাটাল ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক এতে সভাপতিত্ব করেন।
প্যানেল এক্সপার্ট সেশনে মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন বিএমইউর নিওন্যাটাল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক ডা. সুফিয়া খাতুন, রেসিডেন্ট শিক্ষার্থী ডা. শারমিন জাহান ও ডা. নাদিয়া শারমিন।
বিএমইউর নিওন্যাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাদেকা চৌধুরী মনির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ডা. মো. মজিবুর রহমান, অধ্যাপক ডা. তাহমিনা বেগম, অধ্যাপক ডা. সামিনা চৌধুরী ও অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা বলেন, মায়ের বুকের দুধ নবজাতক ও মায়ের জন্য একটি অমূল্য উপহার। এটি নবজাতকের জীবন রক্ষা, সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং বিভিন্ন ধরনের অপুষ্টি প্রতিরোধে একটি প্রমাণভিত্তিক ও কার্যকর উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, শিশুর জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা এবং জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত।
‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়ানো গেলে প্রতি বছর ৮ লাখেরও বেশি শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর প্রায় ১১ দশমিক ৬ শতাংশের সঙ্গে অপর্যাপ্ত বা অনুপযুক্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা সম্পর্কিত।
তারা বলেন, জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো, ছয় মাস পর্যন্ত একচেটিয়া বুকের দুধ এবং দুই বছর বা তারও বেশি সময় তা অব্যাহত রাখা শিশুর ক্ষয়জনিত অপুষ্টি ও স্থূলতাসহ বিভিন্ন ধরনের অপুষ্টি প্রতিরোধে শক্তিশালী সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বাংলাদেশে জন্মের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৪০ শতাংশ এবং ছয় মাস পর্যন্ত একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৫৩ শতাংশ। পূর্ববর্তী তথ্যের তুলনায় এসব সূচকের অবনতি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বক্তারা পরিস্থিতির উন্নয়নে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা বলেন, প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালিত হয়। এর লক্ষ্য হলো বুকের দুধ খাওয়ানোর স্বাস্থ্যগত, পুষ্টিগত ও অর্থনৈতিক উপকারিতা সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর অধিকার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা।
২০২৬ সালের আনুষ্ঠানিক প্রতিপাদ্য হলো ‘টেকসই জীবনের সূচনায় বুকের দুধ খাওয়ানো: যা কার্যকর, তা আরও শক্তিশালী করি’। এ বছরের প্রচারাভিযানের মূল লক্ষ্য বুকের দুধ খাওয়ানোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, প্রমাণিত ও কার্যকর কমিউনিটি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাভিত্তিক উদ্যোগ সম্প্রসারণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বুকের দুধ খাওয়ানোর সহায়তায় ‘উষ্ণ সহায়তার শৃঙ্খল’ আরও সুদৃঢ় করা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সফলভাবে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত পরামর্শ ও কাউন্সেলিং, শিশুবান্ধব হাসপাতাল উদ্যোগ, গণমাধ্যমভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম, বুকের দুধ খাওয়ানো সুরক্ষায় আইন ও নীতিমালা, পর্যাপ্ত ও বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কর্মক্ষেত্রে মায়েদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
তারা আরও বলেন, বুকের দুধ খাওয়ানো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক সহযোগিতা, মাতৃত্ববান্ধব কর্মক্ষেত্র এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকর সহায়তা পেলে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর চর্চা আরও সফল ও টেকসই হয়।
মা ও শিশুর জন্য নিরবচ্ছিন্ন, সহজলভ্য ও সম্মানজনক সহায়তা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও কমিউনিটির প্রতিটি স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান বক্তারা।
তারা বলেন, প্রতিটি পরিবার যাতে তাদের শিশুকে কীভাবে খাওয়াতে চায়, সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সম্মান পায়, এমন একটি সহায়ক সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
বক্তারা বলেন, টেকসই মাতৃদুগ্ধপানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিবার, কমিউনিটি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র ও সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই প্রতিটি মা ও শিশুর জন্য বুকের দুধ খাওয়ানোর একটি সহায়ক, নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।