শিরোনাম

ঢাকা, ৯ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): বেসরকারি খাতের ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে চলমান সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট পলিসি কো-অর্ডিনেশন কমিটি (পিএসডিপিসিসি)।
গতকাল (শনিবার) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কমিটির ১৬তম সভায় এ গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারের সভাপতিত্বে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
সভায় মুখ্যসচিব বলেন, কোনো বিষয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট সংস্কারের প্রয়োজনীয় প্রাথমিক কাজ ও বিশ্লেষণ সম্পন্ন করতে হবে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কমবে এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে।
তিনি পিএসডিপিসিসির আগের সভাগুলোতে প্রস্তাবিত ও সম্মত সংস্কারগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কমিটির কাছে যেসব সংস্কার প্রস্তাব আসে, সেগুলো যথাযথ বিশ্লেষণ ও প্রস্তুতির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এ জন্য কমিটির কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটির সদস্যপদ পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
মুখ্যসচিব ব্যবসার আকার অনুযায়ী একক ও সরলীকৃত করহারসহ পাঁচ বছর মেয়াদি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ট্রেড লাইসেন্স চালুর সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে সংস্কারগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার জন্য আগামী তিন মাসের মধ্যে পরবর্তী পিএসডিপিসিসি সভা আয়োজনের অনুরোধ জানান।
সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক ড. আহমেদ উল্লাহ পিএসডিপিসিসির কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেন।
অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার সরকারি-বেসরকারি সংলাপের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সাতটি থিম্যাটিক ওয়ার্কিং কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) ভূমিকার প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, সুপারিশগুলো পিপিডিপি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হলেও এর বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করে।
এ সময় চামড়া খাতের রপ্তানি সম্ভাবনা এবং বিল্ডের তৈরি খসড়া রপ্তানি রোডম্যাপ নিয়েও আলোচনা হয়। কাঁচা চামড়ার প্রাপ্যতা সম্পর্কে ফুটওয়্যার, লেদার গুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ফ্ল্যাক্সা) পরিচালক এ কে এম মোশফিকুর রহমান জানান, আর্থিক সংকট সত্ত্বেও কাঁচা চামড়া সংগ্রহ বেড়েছে।
এফসিসিআইয়ের মহাসচিব মো. আলমগীর বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরের অকার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) চামড়া খাতের ট্রেসেবিলিটি ও রপ্তানি কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি নিজস্ব ইটিপি সুবিধা থাকা আকিজ গ্রুপের মতো কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দেন।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) প্রেসিডেন্ট কামরান টি. রহমান বলেন, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি নিশ্চিত না করেই চামড়া শিল্পনগরীকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান সিইটিপির নকশাগত ত্রুটির কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, একজন ইতালীয় পরামর্শক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞ বিষয়টি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন তৈরি করছেন। লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেশন অর্জনের জন্য পূর্ণ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা জরুরি হলেও এর জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন ।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহিমা খানম চামড়া শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বলেন, এসব বর্জ্যকে মূলত পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান ও স্লাজ—এই দুই ভাগে দেখা যায়। ঝুঁকিপূর্ণ ক্রোম আলাদা করাকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বর্জ্যকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সম্ভাব্য মডেল নিয়ে ভাবার পরামর্শ দেন।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ সিইটিপির রক্ষণাবেক্ষণে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং কোরবানির চামড়া সংরক্ষণের অবকাঠামো শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন।
আইনগত সংস্কার প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সাইফুদ্দিন আহমেদ ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন চূড়ান্ত করতে বিলম্বের বিষয়টি সভায় তুলে ধরেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি আইনটি চূড়ান্ত করতে এক মাসের সময়সীমা দেয়। একই সময়সীমা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) নীতির জন্যও নির্ধারণ করা হয়।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) যুগ্ম মহাপরিচালক মো. মতিউর রহমান শ্রম ও কমপ্লায়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর সিইটিপির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি অন্তত ৫০টি সক্ষম কারখানাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন।
রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আকবর ছোট কারখানাগুলোর জন্য একটি সাধারণ সিইটিপি এবং বড় কারখানাগুলোর জন্য নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের পরামর্শ দেন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) সচিব ড. নাজনীন কাওসার চৌধুরী চামড়া খাত কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন।
সৌরশক্তি খাত নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মহাপরিচালক কাজী এমদাদুল হক জানান, ৩৯টি সৌরপণ্যের মানদণ্ড তৈরি হয়েছে।
২০২৬-২০২৯ সালের আমদানি নীতিতে ফোটোভোলটাইক মডিউল, সোলার পিভি ইনভার্টার, নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য সেকেন্ডারি সেল ও ব্যাটারি এবং চার্জ কন্ট্রোলার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সবুর হোসেন দেশীয় সৌরপণ্য উৎপাদকদের জন্য নীতিগত সহায়তা চান।
অন্যদিকে, মুখ্যসচিব বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশনসংক্রান্ত বাধা দূর করার তাগিদ দেন। পাশাপাশি সৌরশক্তিতে পাকিস্তানের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে বাজেটে ঘোষিত শুল্কমুক্ত সৌরযন্ত্রাংশ ব্যবহারে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার পরামর্শ দেন। রেলওয়ে খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথাও বলেন।
আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল বাণিজ্যনীতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান জানান, পেমেন্ট অ্যাগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্ম ‘একপে’ পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০২৪-এর ১৮ ধারার আওতায় তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি প্ল্যাটফর্মগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব জানান, আংশিক রপ্তানিকারকদের আমদানি সুবিধা প্রস্তাবিত আমদানি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে আংশিক রপ্তানিকারকেরা কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মতো ফ্রি ট্রেড জোনের আওতায় কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) চূড়ান্ত রিটার্নের মাধ্যমে সমন্বয় বা ফেরত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং এনবিআর ট্যাক্স রিফান্ড কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করার কাজ করছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব পরিমল সরকার জানান, স্থানীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত ট্রেড লাইসেন্স চালুর জন্য একটি কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে।
সভায় বিল্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান বলেন, বিল্ডের সুপারিশগুলো আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাস্তব প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা করে তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, আরও ঘন ঘন সভার মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটিকে গতিশীল করা এবং প্রস্তুতকৃত সুপারিশগুলো যথাযথভাবে কমিটিতে উপস্থাপন করা গেলে সংস্কার বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো সম্ভব।
বিনিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা সহজীকরণ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আওতায় আটটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিষয় তুলে ধরেন বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম। তার উপস্থাপনায় বাংলাদেশে একটি উৎপাদনমুখী ব্যবসা শুরু করতে ১৯টি লাইসেন্স, ১৫৪টি নথিপত্র এবং প্রায় ৪৫৭ দিন পর্যন্ত সময় লাগার বিষয়টি উঠে আসে।
এই জটিলতা কমাতে বিদ্যমান ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদের (ইআরসি) প্রয়োজনীয়তা প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব দেন তিনি। এতে রাজস্বের সামান্য ক্ষতি হলেও এসএমই খাত উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হবে বলে তিনি জানান।