শিরোনাম

ঢাকা, ৮ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): রাজধানীর ভবনগুলোর ত্রুটি চিহ্নিত করে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পে ভবন ধসে পড়ার জন্য শুধু ভবনের উচ্চতা দায়ী নয়; ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা এবং নির্মাণে অনিয়মও এর অন্যতম প্রধান কারণ। তাই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, মাটি পরীক্ষা এবং প্রকৌশলগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।
আজ শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘ভূমিকম্প ঝুঁকিতে দেশ: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী হাসান আনসারী।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক ভবন রয়েছে। এসব ভবনের ঝুঁকি একসঙ্গে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এজন্য ধাপে ধাপে র্যাপিড ভিজ্যুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রিলিমিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট এবং ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাজউকের সক্ষমতা বাড়াতে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভূমিকম্পের আগে ঝুঁকি নিরূপণ, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব শুধু রাজউকের নয়। সিটি করপোরেশন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কার্যকর সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা থাকলে নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কাজ আরও সহজ ও সমন্বিতভাবে করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, অনুমোদিত ছয়তলা ভবনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ১০ তলা করা কিংবা অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করে নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হবে না। এ ধরনের ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আইনগত যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ভবনের নকশা প্রণয়নকারী স্থপতি ও প্রকৌশলীদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নকশায় স্বাক্ষর করার পাশাপাশি নির্মাণকাজের বাস্তবায়ন ও তদারকিতেও তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। অনিয়ম হলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি ভবন মালিকদের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ এবং অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে অনিয়মের তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া অভিযোগ যাচাই করে রাজউক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
রিয়াজুল ইসলাম বলেন, রাজউকের দুর্বল উপস্থিতিকে শক্তিশালী উপস্থিতিতে পরিণত করাই তার লক্ষ্য। এজন্য ভবন নির্মাণে অনিয়ম, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ কাজ একদিনে সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাজ শুরু হয়েছে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ভবন নির্মাণের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে নিয়মিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রকৌশলী ও তদারকি সংস্থাগুলোকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডেভেলপারদের সহযোগিতা করতে হবে। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ভবনের নকশা ও নির্মাণ নিশ্চিত করা গেলে টেকসই ও নিরাপদ ভবন নির্মাণ সম্ভব।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি শুধু ভবনের নকশা বা নির্মাণমানের ওপর নির্ভর করে না; ভবনটি কোথায় এবং কী ধরনের মাটির ওপর নির্মিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল ও জলাভূমি এলাকায় অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।
তিনি দুর্বল মাটির ওপর ভবন নির্মাণ বন্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ঢাকায় অনুমোদিত ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঢাকার প্রায় ৬ লাখ ভবনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। ভূমিকম্পের সময় সচেতনতার পাশাপাশি সারা বছর গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক সংবাদ প্রচার করতে হবে। আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা গেলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। সমন্বিতভাবে সব অংশীজনকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এ জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পর দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় ফায়ার সার্ভিসের কিছু প্রস্তুতি রয়েছে। ঢাকার আশপাশের ৪১টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে এবং বিশেষ রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এসব প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
সালেহ উদ্দিন বলেন, ভূমিকম্পে মানুষ সরাসরি মারা যায় না, বরং ভবন ও স্থাপনা ধসে পড়ার কারণে প্রাণহানি ঘটে। তাই ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার পাশাপাশি ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, কমিউনিটি ও জাতীয় পর্যায়েও আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
ডুরার সভাপতি শাহজাহান মোল্লা বলেন, ঢাকাসহ সারাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতিসংক্রান্ত তথ্যের আলোকে কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়, সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য তুলে ধরে সরকার ও রাজউকের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমেও সহযোগিতা করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডুরা’র সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম। এ সময় ডুরা’র প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মিরাজ মাহবুব ইফতি, সিনিয়র সাংবাদিক রিপন তালুকদারসহ সংগঠনের সদস্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।