শিরোনাম

ঢাকা, ৮ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস): সুরভী ইয়াসমিন। একজন ট্রাভেলার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর। যিনি পরিবারের বাধা, সমাজের কটূক্তি আর চাকরির নিরাপদ জীবন পেছনে ফেলে প্যাশনের পথে হাঁটেন। দেশের ৪৫ জেলা ও ৬ দেশ ঘুরে এখন সফল ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
সম্প্রতি এই প্রতিবেদককে সুরভী জানালেন তার এগিয়ে যাওয়ার গল্প। এ সময় যেন স্মৃতির ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যান তিনি। জানালেন, বন্ধুদের ঘুরে বেড়ানোর ছবি দেখে মনে স্বপ্ন জেগেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের মতো অর্থ ছিল না। পরিবারের সমর্থনও ছিল না। বরং একা ঘোরাঘুরি করতে চাওয়ার কারণে শুনতে হয়েছে নানা কটূক্তি ও প্রশ্ন।
তবুও থেমে যাননি সুরভী ইয়াসমিন। ছোটোবেলার পেইন্টিং বিক্রি করে পাওয়া টাকা জমিয়েছেন, ছোটোখাটো কাজ ও ভলান্টিয়ারিং করে আয় করেছেন, আর সেই অর্থ দিয়েই শুরু করেছেন ভ্রমণ।
আজ সেই সুরভীই দেশের অন্যতম পরিচিত ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের একজন। বাংলাদেশের ৪৫টি জেলা ঘুরেছেন, ভ্রমণ করেছেন ছয়টি দেশে। কাজ করছেন প্রায় ৭০টি ব্র্যান্ডের সঙ্গে। তবে তার এই সাফল্যের গল্পের শুরুটা কোনো দামি ক্যামেরা কিংবা বড় বাজেট দিয়ে নয়-শুরু হয়েছিল নিজের হাতে আঁকা পেইন্টিং বিক্রির টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, ঘোরাঘুরি আমার কাছে কখনো বিলাসিতা ছিল না, স্বপ্ন ছিল।
বন্ধুদের ভ্রমণ দেখে স্বপ্নের শুরু
সুরভী তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। পড়াশোনার ফাঁকে অবসর সময়ে ২০১৬ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের ঘুরে বেড়ানোর ছবি ও ভিডিও দেখতেন। অন্যরা যখন নতুন নতুন জায়গা ঘুরে দেখছে, তখন তার মনেও তৈরি হয় অদম্য এক ইচ্ছা-তিনিও ঘুরবেন, দেখবেন অচেনা পৃথিবী।
কিন্তু স্বপ্ন থাকলেও হাতে ছিল না অর্থ। ‘আমার তখন নিজের কোনো ইনকাম ছিল না। কিন্তু ঠিক করেছিলাম, যেভাবেই হোক আমাকে ঘুরতে হবে,’ বলছিলেন তিনি।
এই ‘যেভাবেই হোক’ মানসিকতাই শেষ পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দেয় নিজের স্বপ্নের কাছে। ছোটোবেলা থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি আগ্রহ ছিল সুরভীর। নিজের সেই প্রতিভাকেই কাজে লাগান তিনি।
‘আমি পেইন্টিং করতাম। তারপর সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা পেতাম, সেটা জমাতাম। সেই টাকা দিয়েই ট্রাভেল শুরু করি।’
শুরুটা ছিল খুবই ছোট। মাসে এক বা দুটি ট্রিপ। আর প্রতিটি ভ্রমণের বাজেট ছিল মাত্র ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা। ‘অনেকেই ভাবে ট্রাভেল করতে হলে অনেক টাকা লাগে। কিন্তু আমি খুব লো বাজেটে শুরু করেছি।’
পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ছোটোখাটো কাজ ও ভলান্টিয়ারিংও করতেন সুরভী। সেখান থেকে পাওয়া অর্থও জমা হতো তার ভ্রমণ তহবিলে, যা দিয়ে তিনি ভ্রমণে বের হয়ে যেতেন।
অর্থ নয়, সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সমাজ
সুরভীর ভ্রমণের পথে অর্থের চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সামাজিক বাস্তবতা। একজন মেয়ের একা ঘোরাঘুরি করবে-এই বিষয়টি তখনও অনেকের কাছে সহজভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
পরিবার থেকে এসেছে বাধা। আত্মীয়স্বজন ও আশপাশের মানুষ করেছেন নানা প্রশ্ন। কিন্তু থেমে যাননি সুরভী। তার ভাষ্য, ‘আমার পরিবার খুব রক্ষণশীল ছিল। তারা চাইত না আমি একা বাইরে যাই। পরিবারের বাইরেও অনেকেই বলত-মেয়ে হয়ে তুমি একা কেন ঘোরো? এসব শুনতে হতো। কিন্তু ‘আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলাম।’
২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়টায় তিনি ঘুরেছেন, শিখেছেন এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। তখনো ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তবে মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগে পড়াশোনার সুবাদে ক্যামেরা ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল তার।
‘আমি ট্রাভেল করতাম আর ছবি তুলতাম। পরে ভাবলাম, এগুলোতো শেয়ার করা যায়। এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় কনটেন্ট ক্রিয়েশন।’
ভ্রমণ থেকে কনটেন্ট, কনটেন্ট থেকে পরিচয়
ধীরে ধীরে ভ্রমণকে কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরি শুরু করেন সুরভী। তার উদ্দেশ্য ছিল শুধু নিজের ভ্রমণের গল্প বলা নয়, বরং অন্যদেরও ভ্রমণে উৎসাহিত করা। তিনি বলেন, ‘আমি চাইতাম মানুষকে ইনস্পায়ার করতে-যাতে তারা বুঝতে পারে, কম টাকাতেও ট্রাভেল করা সম্ভব।’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় তার নিজস্ব পরিচয়। ভ্রমণ হয়ে ওঠে তার কনটেন্টের প্রধান বিষয়, আর সেই কনটেন্টই তাকে নিয়ে যায় নতুন এক পেশাগত জগতে।
নিরাপদ চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত পথে
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে করপোরেট সেক্টরে চাকরিতে যোগ দেন সুরভী। প্রায় চার বছর চাকরি করেন তিনি। জীবনে তখন ছিল নিয়মিত আয়, নিরাপদ ক্যারিয়ার। কিন্তু মনের ভেতর চলছিল অন্যরকম এক টানাপড়েন।
‘আমি সবসময় ভাবতা- আমি কি এই চাকরিটা সারাজীবন করব? নাকি আমার প্যাশনটা ফলো করব?’
অবশেষে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে সিদ্ধান্তটি হুট করে নেওয়া ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমি কিন্তু হুট করে চাকরি ছাড়িনি। হিসাব করে, পরিকল্পনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
চাকরি ছাড়ার পরের ছয় মাস ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়। ছিল না কোনো নিয়মিত আয়। তারপরও নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি। তিনি বলেন, কোনো আয় ছিল না। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। সংকটের মাঝেও ট্রাভেল বন্ধ করিনি।
৬-৭ লাখ টাকার ‘বিলাসিতা’ নয়, ছিল বিনিয়োগ
ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে নিতে প্রয়োজন ছিল আধুনিক সরঞ্জামের। নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ধীরে ধীরে ক্যামেরা, ড্রোন, মাইক্রোফোনসহ বিভিন্ন ট্রাভেল গিয়ার কিনেছেন সুরভী। সব মিলিয়ে সরঞ্জাম কিনতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা।
‘অনেকে ভাবে এগুলো বিলাসিতা। কিন্তু আমার জন্য এগুলো ছিল বিনিয়োগ,’ বলেন তিনি। সেই বিনিয়োগই আজ তার পেশাগত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
৭০ ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ, শুরুটা ছিল প্রত্যাখ্যান দিয়ে
সুরভী ইয়াসমিন বর্তমানে প্রায় ৭০টি ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছেন। তবে ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ পাওয়ার পথটিও ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। শুরুর দিকে ব্র্যান্ডগুলো তার কাছে আসেনি। বরং নিজেকেই যেতে হয়েছে তাদের দরজায়। তিনি বলেন, আমি নিজে ব্র্যান্ডগুলোর কাছে যেতাম, প্রেজেন্টেশন দিতাম, বোঝাতাম কেন তারা আমার সঙ্গে কাজ করবে।
অনেক জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। সুরভী বলেন, প্রক্রিয়াটা সহজ ছিল না।
অনেক জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমি জানতাম, একদিন হবে। এখন সেটা হয়েছে।
সমালোচনা থামাতে পারেনি সুরভীকে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তার সঙ্গে এসেছে সমালোচনাও। একা ভ্রমণ করা, পোশাক কিংবা জীবনধারা-বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাকে শুনতে হয়েছে নেতিবাচক মন্তব্য। শুরুতে এসব মন্তব্য কষ্ট দিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে তার দৃষ্টিভঙ্গি।
‘আগে কষ্ট পেতাম। পরে বুঝেছি-সবাই আসলে আমার অডিয়েন্স না। এখন আমার অবস্থান পরিষ্কার, আমি এগুলোতে পাত্তা দিই না। যারা এসব বলে, তারা আমার জন্য না। আমি আমার কাজ করে যাব।’
বদলে গেছে পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গিও
যে পরিবার একসময় একা ভ্রমণ করতে দিতে চাইত না, সময়ের সঙ্গে সেই পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে।
‘শুরুতে তারা বুঝত না। এখন তারা আমাকে সাপোর্ট করে,’ বলেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনেও পেয়েছেন সহায়ক একজন জীবনসঙ্গী। এ বিষয়ে সুরভীর ভাষ্য, এখন তো আমি এমন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি, যে আমার স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করে, আমার কাজকে সমর্থন করে। সেই কারণে আমি যেভাবে থাকতে চাই, সেভাবেই থাকতে পারি।
স্ক্রিপ্ট থেকে এডিটিং-সবই একা
সুরভীর ট্রাভেল কনটেন্ট তৈরির আরেকটি বিশেষ দিক হলো-তার কাজের বেশিরভাগই তিনি নিজেই করেন।
‘আমার কনটেন্টের স্ক্রিপ্টিং, শ্যুটিং, এডিটিং-এগুলো সব আমিই করি। কখনো কখনো খুব প্রয়োজন হলে অন্য কারও সাহায্য নিই। কিন্তু সেটা খুবই কম। বেশিরভাগ সময়ই একাই কাজ করি,’ বলছিলেন এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে তাকে একসঙ্গে অনেক ভূমিকা পালন করতে হয়-ট্রাভেলার, স্ক্রিপ্ট রাইটার, ক্যামেরাপারসন, এডিটর ও গল্পকার।
৪৫ জেলা, ৬ দেশ
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রায় ৪৫টি জেলা ঘুরেছেন সুরভী। দেশের সীমানা পেরিয়ে ভ্রমণ করেছেন ছয়টি দেশে। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাকে শুধু নতুন জায়গা দেখায়নি, বরং মানুষের সঙ্গে মিশতে ও জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
আলাপ-চারিতায় সুরভী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ। আমি যেখানেই গেছি, মানুষ আমাকে সাহায্য করেছে।’
তার বিশ্বাস, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অনেকটাই নির্ভর করে নিজের মানসিকতার ওপর। ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনি যদি পজিটিভ এনার্জি নিয়ে কোথাও যান, আপনি পজিটিভ অভিজ্ঞতাই পাবেন,’ বলেন তিনি ।
নতুনদের জন্য সুরভীর পরামর্শ
ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে নিতে চাইলে শুধু ভ্রমণের ইচ্ছা থাকলেই হবে না-প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধৈর্য, পরিশ্রম ও আর্থিক প্রস্তুতি।
‘কেউ ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে চাইলে তাকে দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে থাকতে হবে, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং আর্থিক পরিকল্পনাটা ঠিকঠাকভাবে করতে হবে।’
সুরভীর পরামর্শ, শুরুতেই সাফল্যের প্রত্যাশা না করে অন্তত এক থেকে দেড় বছর নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে তৈরি করতে হবে মাল্টিটাস্কিং স্কিল।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখার কথাই বলেন এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
বলেন, ‘আসলে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার কোনো বিকল্প নেই। যদি প্যাশন থাকে, নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকে, লক্ষ্য ঠিক থাকে, তাহলে যত বাধা, সীমাবদ্ধতা বা সমালোচনা আসুক না কেন, একসময় ঠিকই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে।’
নিজের পেইন্টিং বিক্রি করে সঞ্চয় করা এই তরুণী আজ একজন সফল ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর। সুরভীর গল্প তাই শুধু ভ্রমণের নয়। এটি নিজের স্বপ্নকে বিশ্বাস করার, প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার ও অনিশ্চিত পথেও নিজের পরিচয় তৈরি করে নেওয়ার গল্প।