বাসস
  ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪১

চট্টগ্রামে আঞ্চলিক ভাষার গ্রাফিতি এখনও আলোড়ন তুলে

ছবি: বাসস

॥ আবু মোশাররফ ॥

চট্টগ্রাম, ৫ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : ‘বউত দিন হাইয়ো, আর নো হাইয়ো’ (অনেক দিন খেয়েছো, আর খেয়ো না)-চট্টগ্রামে আঁকা এই গ্রাফিতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গভীর বার্তা দেওয়া একটি স্মারক চিহ্ন। আঞ্চলিক ভাষায় রচিত এই ধরনের বেশ কয়েকটি গ্রাফিতি সেই সময়ে যেমন আলোড়ন তুলেছিল মানুষের মনে, তেমনি এখনও সেগুলো সমান জনপ্রিয় মানুষের কাছে।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন থেকেই ছাত্ররা সারা দেশের দেওয়ালগুলোতে গ্রাফিতি আঁকা শুরু করে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বিভাগীয় শহরের প্রধান সড়কের দুইপাশজুড়ে আঁকা হয় বিভিন্ন পেইন্টিং, দেয়াল লিখন আর কার্টুন। সেসব গ্রাফিতিতে দেওয়া হয় গভীর কোনো বার্তা, কঠোর হুঁশিয়ারি কিংবা রয়েছে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশাও। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আঞ্চলিক ভাষায় রচিত বেশ কিছু গ্রাফিতি মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নেয়। তার মধ্যে নির্দিষ্ট একটি গ্রাফিতি দ্রুতই মানুষের মুখে মুখে হয়ে যায়, যে কোনো ঘটনাক্রমে বৈষম্যমূলক আচরণ পরিলক্ষিত হলেই সেটি এখনও উচ্চারণ করে চট্টগ্রামের মানুষ।

নগরীর চকবাজার কলেজ রোডের দেবপাহাড় মোড়ের মুখে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় একটি গ্রাফিতি অংকন করেন শিক্ষার্থীরা- ‘বউত দিন হাইয়ো, আর নো হাইয়ো’ (অনেক দিন খেয়েছো, আর খেয়ো না)। পতিত হাসিনা সরকারের বিভিন্নমুখী অর্থনৈতিক লুটপাটকে ইঙ্গিত করে এই গ্রাফিতি আঁকা হয় বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছিল। এই গ্রাফিতিতে সরকারি বা জনগণের সম্পদ লুট করে বেহাত করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। আঞ্চলিক ভাষার এই শ্লোকটি চট্টগ্রামের মানুষের খুবই ‘মনে ধরে যায়।’ সঙ্গে সঙ্গে সেটি শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মুখে মুখে হয়ে যায়। স্থানীয় মানুষজন নানা অনুষঙ্গে পরস্পরকে উদ্দেশ করে সেই গ্রাফিতির ভাষা উচ্চারণ করে।

চট্টগ্রাম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করে বাসসকে আজ বলেন, ‘আঞ্চলিক ভাষায় প্রতিবাদের স্লোগান পেয়ে মানুষ বেশ উজ্জীবিত হয়েছিল, কারণ তাতে তাদের মনের কথাটি ফুটে উঠেছিল। দুই বছর পর এসেও এই স্লোগানটি সমান জনপ্রিয়। এখনও মানুষ কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ করতে দেখলে, কেউ দুর্নীতি করছে জানতে পারলে গ্রাফিতির ভাষাটি উচ্চস্বরে ছুড়ে মারে।’

সারা দেশে শত শত বিষয়ে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। চট্টগ্রামের গ্রাফিতিতে প্রাধান্য ছিলেন শহীদ ওয়াসিম-শান্তরা। 

জাতীয়ভাবে আঁকা গ্রাফিতির ভাষাগুলোতে আছে-ই; আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গ্রাফিতিগুলো চট্টগ্রামের মানুষের মনে দারুণ আলোড়ন তুলেছিল। গত দুই বছরে সড়কে গ্রাফিতির রং কিছুটা বিবর্ণ হয়ে আসছে কিন্তু আঞ্চলিক ভাষার বার্তাগুলো মানুষের মনে গেঁথে গেছে, এখনও পথে-প্রান্তরে এসব ভাষা উচ্চারিত হতে শোনা যায় হরহামেশা।

চট্টগ্রামে আঞ্চলিক ভাষায় আঁকা আরেকটি গ্রাফিতি হলো- ‘ঘুষ চাইলি মাইজে্যুাম’ অর্থাৎ ঘুষ দাবি করলে মাইর দেওয়া হবে। সরকারি অফিসে বছরে পর বছর ধরে যে অবৈধ ঘুষ লেনদেন হয়; জুলাই বিপ্লবের পর সে পরিস্থিতি যেন আর না থাকে তাই ঘুষ দাবিকারীদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে এই গ্রাফিতিতে। এটিও অফিস-আদালতে এখনও বেশ আলোড়ন তুলে। কোথাও ঘুষের প্রসঙ্গ বা ঘুষ দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে গ্রাফিতির ভাষাটি উচ্চারণ করেন চট্টগ্রামের মানুষ।

আঞ্চলিক ভাষার আরেকটি গ্রাফিতিতে তুলে ধরা হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা আর সেখানে প্রশ্ন কঠিন তোলা হয়েছে? গ্রাফিতিটি এ রকম- ‘রাজায় যহন প্রজার জান লয়, জিগা তাইলে রাজা-কার?’ একই ধরনের আরেকটি গ্রাফিতিতে তরুণরা আহ্বান জানিয়েছেন আন্দোলন বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ার আন্দোলন অব্যাহত রাখতে। সেখানে বলা হয়েছে- ‘রাজা যায় রাজা আসে, ঢেউ শেষে ঢেউ, বিদ্রোহ জারি রেখো, জিতে গেলেও!’

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গ্রাফিতিগুলো সম্পর্কে অনুভূতি জানতে চাইলে আজ ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বাসসকে বলেন, ‘আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে ভাষা-সংস্কৃতির মধ্যে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে। সে কারণে মানুষ আঞ্চলিক ভাষাকে একেবারেই আপন বলে ভাবতে পারে। 

সেই ভাষাতে যখন কোনো আবেদন, বার্তা দেওয়া হয় সেটি দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আমাদের অস্তিত্বের অহংকার। সেই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে বার্তা আঞ্চলিক ভাষায় রচিত হয়েছে সেগুলো মানুষের মনে রয়ে যাবে শত শত বছর ধরে। একই সাথে এই আহ্বান, এর গভীর যে মমার্থ তা আমাদের ধারণ ও লালন করতে। তবেই জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।