শিরোনাম

ঢাকা, ৩০ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে। এই ধারা বজায় থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের অর্থনীতি প্রায় ৭ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত একটি নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া যখন ২০৫০ সালের মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তালিকায় আরও ২৮ কোটি মানুষকে যুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখন এই ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এ অঞ্চলের কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘এ লিভেবল ফিউচার : প্রটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়া’স সিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০৭০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫২ কোটি মানুষ প্রতি বছর অন্তত এক মাস বিপজ্জনক তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে পারে, যা বর্তমান পরিমাণের চেয়ে চার গুণ বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চরম তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই শ্রমের উৎপাদনশীলতা হ্রাস করছে, ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত করছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের পরিবার, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী, নারী, বয়োবৃদ্ধ এবং শিশুরা এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলো এই অঞ্চলের ভবিষ্যতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এখানকার কর্মসংস্থান, জীবিকা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
তিনি বলেন, তাপমাত্রা-সহনশীল শহর গড়ে তোলার লক্ষ্য কেবল মানুষকে তীব্র গরম থেকে রক্ষা করা নয়; বরং এটি কর্মসংস্থান রক্ষা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শহরগুলো যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে টিকে থাকে তা নিশ্চিত করার বিষয়। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে দেশগুলো আরও সহনশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিবেদনে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নিরিখে চরম তাপমাত্রার প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়, কীভাবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা শ্রমিক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, জনসেবা এবং নগর অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
প্রতিবেদনে যুক্তি দেখানো হয়, চরম তাপমাত্রাকে আর কেবল একটি সাময়িক বা ঋতুভিত্তিক জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়; বরং এটিকে একটি প্রধান উন্নয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ, সরকারি নীতি এবং বেসরকারি খাতের উন্নয়নে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি বাস্তব রূপরেখা ওঠে এসেছে, যা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান এবং অর্থায়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এতে আরও সহনশীল শহর গড়ে তোলার জন্য তাপ-সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, ‘হিট অ্যাকশন প্ল্যান’ বা তাপপ্রবাহ মোকাবিলা পরিকল্পনা জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিকদের সুরক্ষা, টেকসই শীতলীকরণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের গতিশীলতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) অর্থায়নে পরিচালিত তাদের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন ফর আ রেজিলিয়েন্ট এশিয়া (সিএআরএ)’-এর অধীনে ‘রেজিলিয়েন্ট এশিয়া প্রোগ্রাম (আরএপি)’-এর সহায়তায় এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি (জিএফডিআরআর)’ এবং ‘সিটি রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম (সিআরপি)’ও এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স লিড জন ওয়ারবার্টন বলেন, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করছে, জনস্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি একটি উন্নয়ন সংকট, যা বিভিন্ন খাতে টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি রাখে। এই কারণেই যুক্তরাজ্য সরকার আমাদের ফ্ল্যাগশিপ ক্লাইমেট অ্যাকশন ফর আ রেজিলিয়েন্ট এশিয়া কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে জ্ঞান সৃষ্টি, নীতি প্রণয়নে তথ্য সরবরাহ এবং একটি উষ্ণায়নশীল গ্রহের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে এই অঞ্চলে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা উন্মোচন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জন ওয়ারবার্টন বলেন, ইতোমধ্যে এসব সমস্যার অনেক সমাধান রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে- কীভাবে হিট অ্যাকশন প্ল্যান, সহনশীল অবকাঠামো, নগর বনায়ন বা সবুজায়ন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থা মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে, শ্রমিকদের রক্ষা করতে পারে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে পারে। এই পদ্ধতিগুলোর পরিধি বাড়াতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত সমন্বয় এবং বৃহত্তর সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্রুত নগরায়ণের এই সময়ে সরকারগুলোর বর্তমান সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে শহরগুলো ভবিষ্যতেও কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে, নাকি ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে উন্নয়নের গতি বাধাগ্রস্ত হবে। তাই মানুষের সুরক্ষা, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে তাপ-সহনশীলতায় বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।