বাসস
  ২০ মে ২০২৬, ১৯:৪৮

সেনা কর্মকর্তা তানজিম সারোয়ার হত্যা মামলায় ৪ জনের মৃত্যুদণ্ড, ৯ জনের যাবজ্জীবন

সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন। ফাইল ছবি

কক্সবাজার, ২০ মে, ২০২৬ (বাসস) : কক্সবাজারের চকরিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযান চলাকালে সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছে জেলার একটি আদালত।

পৃথক দুটি মামলায় চারজনকে মৃত্যুদণ্ড, ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর পাঁচজনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (পঞ্চম) আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী আজ এ রায় ঘোষণা করেন।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) খোরশেদ আলম চৌধুরী ও বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর এ তথ্য জানান।

উভয়পক্ষের আইনজীবী জানান, মামলার রায় প্রদানকালে ১২ জন অভিযুক্ত আদালতে উপস্থিত ছিলেন। একজন আসামি পলাতক রয়েছেন।

আইনজীবীরা জানান, আজ মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। সকাল ১১টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে ১২ আসামিকে আদালতে আনা হয়। বিচারক ডাকাতি ও হত্যা মামলায় চারজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পাঁচজনকে খালাস প্রদান করে রায় দেন। এছাড়া পুলিশের দায়ের করা পৃথক অস্ত্র মামলায় ১৩ জনকে ১৭ বছর করে কারাদণ্ড ও পাঁচজনকে খালাস প্রদান করে রায় দিয়েছেন আদালত।

হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চারজন হলোÑ চকরিয়ার ডুলহাজার ইউনিয়নের পূর্ব ডুমখালী এলাকার জাফর আলমের ছেলে মো. হেলাল উদ্দিন, রিংভং এলাকার মৃত কামাল হোসেনের ছেলে নুরুল আমিন, পূর্ব ডুমখালী এলাকার আবদুল মালেকের ছেলে মো. নাছির উদ্দিন, একই এলাকার আবুল কালাম কবিরাজের ছেলে মোর্শেদ আলম।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ জন হলো, চকরিয়া পৌরসভার কাহারিয়াঘোনার নুরুল কবিরের ছেলে জামাল উদ্দিন বাবুল, পতিয়ারঘোনা এলাকার মৃত শহর মুল্লুকের ছেলে মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, ভরামুহুরি এলাকার আকতার আহমদের ছেলে মোহাম্মদ আনোয়ার হাকিম, পূর্ব মাইজপাড়ার মোজাফ্ফর আহমদের ছেলে জিয়াবুল করিম, একই এলাকার নুরুল আলমের ছেলে মো. ইমাঈল হোসেন, পূর্ব মাইজপাড়ার মৃত নুরুল আলমের ছেলে এনামুল হক প্রকাশ তোতা এনাম, পূর্বডুমখালী এলাকার মৃত নুরুল ইসলাম লালুর ছেলে মোহাম্মদ এনাম, রংমহল এলাকার নুর আলম মিস্ত্রির ছেলে মো. কামাল, রিংভং এলাকার গোলাম কাদেরের ছেলে আবদুল করিম।

মামলার রায় প্রদানকালে ১৩ জনের মধ্যে গোলাম কাদেরের ছেলে আবদুল করিম ছাড়া অপর ১২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রায় ঘোষণার পরপরই আদালত এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয় আদালত প্রাঙ্গণে। পরে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের একে একে আদালত ভবন থেকে বের করে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয় এবং কড়া পাহারায় কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায় এক মৎস্য ব্যবসায়ীর বাড়িতে সশস্ত্র ডাকাত দলের হানা দেওয়ার খবর পায় যৌথ বাহিনী। খবর পেয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল সেখানে অভিযানে যায়।

অভিযান চলাকালীন রাত আনুমানিক ৩টার দিকে যৌথ বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাত দলের সদস্যরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ডাকাত দলের এক সদস্যকে তাড়া করে ধরে ফেলেন তরুণ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন। ডাকাত দলের ওই সদস্য এবং তার সহযোগীরা লে. নির্জনকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে রামু সিএমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

ঘটনার পরদিন চকরিয়া থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। ডাকাতির প্রস্তুতি ও সেনা কর্মকর্তা হত্যার অভিযোগে সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার মো. আবদুল্লাহ আল হারুনুর রশীদ বাদী হয়ে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। একই ঘটনায় উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গুলির প্রেক্ষিতে চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে অপর মামলাটি দায়ের করেন।

হত্যাকাণ্ডের পর চকরিয়া থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রধান অর্থদাতা মো. বাবুল প্রকাশসহ সরাসরি জড়িত বেশ কয়েকজন আসামিকে দেশীয় অস্ত্র, গুলি ও ছুরিসহ গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি চকরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরী মোট ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে পৃথক দু’টি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। দীর্ঘ সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ ঘটনার প্রায় ২০ মাসের মাথায় এই রায় ঘোষিত হলো।

নিহত তরুণ সেনা কর্মকর্তা তানজিম সারোয়ার নির্জন পাবনা ক্যাডেট কলেজের সাবেক ছাত্র। তিনি ২০২২ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে আর্মি সার্ভিস কোরে কমিশন লাভ করেছিলেন। তার বাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করের বেটকা গ্রামে।