শিরোনাম

ঢাকা, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : ‘এক-এগারো’ অর্থাৎ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারিতে জরুরি অবস্থা জারি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
এই পরিকল্পনা বিষয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনের সাক্ষ্যে বলা হয়েছে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ হেলালের সঙ্গে গুলশানে গোপন বৈঠক করেছিলেন।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম ‘বাংলাফ্যাক্ট’ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাফ্যাক্ট জানায়, ২০০৭ সালের ১/১১-কে কেন্দ্র করে জরুরি অবস্থা জারি এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা ছিল বাংলাদেশের পরবর্তী দেড় দশকের রাজনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ের মূল বিন্দু। সম্প্রতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মানবপাচার মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। তার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগসহ মোট ১১টি মামলা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ‘সোয়াস’-এর এক গবেষণা প্রকাশনায় ১/১১-এর প্রেক্ষাপট ও প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাপত্রটির শিরোনাম- ÔThe 1-11 Government and the Consequences of ÔNew BangladeshÕ Anti-Corruption in Bangladesh 2007–2009Õ।
বাংলাফ্যাক্টের ভাষ্য অনুযায়ী, গবেষণার ৩৭-৩৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর অনুরোধে একটি খসড়া নথি তৈরির মধ্য দিয়ে জরুরি অবস্থা জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গবেষণায় জেনারেল মাসুদের সঙ্গে পতিত স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ও ঘটনাপ্রবাহের উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাফাক্টের পক্ষ থেকে এখানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদের (অব.) ভূমিকার অংশটি হুবহু অনুবাদ করে দেওয়া হলো:
‘এটি সবাই স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১/১১ ছিল অন্যতম এক বাঁক। তবে সে সময়ে ঠিক কী ঘটেছিল এবং কীভাবে ঘটেছিল, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। তর্কের মূল জায়গাটা হলো, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কি কেবল নির্বাচনী সংকট মেটানোই লক্ষ্য ছিল? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল। অনেকেই দাবি করেছেন, কিছু বিশেষ পক্ষ বিভিন্ন ঘটনায় জনসমক্ষে যে ভূমিকা রেখেছেন বলে দেখা গিয়েছিল, পর্দার আড়ালে তাদের ভূমিকা ছিল তার চেয়েও বেশি। অর্থাৎ তারা নিজেদের সুবিধার্থে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেছিল। কারও কারও মতে, এই ঘটনাগুলো ছিল ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্যে সাজানো এক চক্রান্ত। আবার কারো বিশ্বাস, শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের চেয়েও বড় কিছু অর্জনের লক্ষ্যে ভারতের সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কেউ কেউ পশ্চিমা দূতাবাস এবং দাতাগোষ্ঠীদের কথিত ‘মঙ্গলবার ক্লাব’ (Tuesday Club)-এর মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবের ওপরও জোর দিয়েছেন।’
বাংলাফ্যাক্টের প্রতিবেদনে গবেষণাপত্রের সূত্রে বলা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সামরিক কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর মতে, ওয়ান ইলেভেন আসলে আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল। তার দাবি, পরিকল্পনার বিষয়টা তিনি সরাসরিই জানতেন এবং ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর অনুরোধে একটি খসড়া নথি তৈরির মাধ্যমেই এই প্রক্রিয়ার শুরু হয়েছিল। তার (ব্যবসায়ীর) সেই বিবরণটি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হলো:
‘জেনারেল মাসুদ একদিন আমাকে তার সাথে দেখা করতে বলেন। সেটা ছিল ২০০৬ সাল। দেশের অবনতি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন, এবং কিছু একটা করা দরকার বলে তিনি জানান ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ম্যাডামের (বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে এটা নিয়ে কথা বলব।’ তিনি এ নিয়ে ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন কি না তা জানতে কয়েকদিন পর আমি আবার তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলাম। তিনি (জেনারেল মাসুদ) নিশ্চিত করলেন, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান-উভয়ের সাথেই তিনি কথা বলেছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ম্যাডামের প্রতিক্রিয়া কী ছিল। তিনি অস্পষ্টভাবে একটা উত্তর দিলেন। পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে তাদের মধ্যে কথাবার্তা হয়ে থাকলেও, সম্ভবত কোনো পদক্ষেপের ব্যাপারে তারা একমত হতে পারেননি। পরে একদিন তিনি আমাকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার একটা খসড়া তৈরি করতে বললেন এবং আমি সেটি তৈরি করে দিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, খালেদা জিয়া জানতেন যে জেনারেল মাসুদ জরুরি অবস্থা জারি করতে চেয়েছিলেন। এটি ছিল ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবরের ঘটনা।’
পরের ঘটনা বিষয়ে গবেষণাপত্রে ওই ব্যবসায়ীর জবানিতে বলা হচ্ছে, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করল এবং ইয়াজউদ্দীন প্রধান উপদেষ্টা হলেন, তিনি (মাসুদ) আমাকে গুলশানের একটি জায়গায় দেখা করতে বললেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন তিনি আমাকে সেখানে যেতে বলছেন। তখন তিনি বুঝিয়ে বললেন যে, সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তি এবং স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) একজন সদস্য থাকবেন। এটি ওয়ান-ইলেভেনের এক বা দুই দিন আগের ঘটনা। ওই সময়ের মধ্যেই ওয়ান-ইলেভেনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর, আলোচনার জন্য শেখ হাসিনা এলেন এবং তার সঙ্গে শেখ রেহানা ও শেখ হেলালও ছিলেন। কয়েক দিন পর জেনারেল মাসুদ আমাকে একটি বার্তা (টেক্সট) পাঠিয়ে লিখলেন ‘ডিক্লেয়ারড’ (ঘোষিত), এবং আমি বুঝে গেলাম তিনি আসলে কী ঘোষণা করেছেন। বিএনপি’র কাছ থেকে সবকিছু আড়ালে রেখে ওয়ান ইলেভেনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলো এবং তখন আমি বুঝলাম যে তিনি এটি আওয়ামী লীগকে জানিয়েই করেছিলেন।’
ব্যবসায়ী ব্যক্তি আরও বলেন, ‘জেনারেল মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারিকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার সই করা কাগজপত্রগুলো আমাকে দেখাতে বললেন। তারা ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবরের তারিখটি বদলে সেখানে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বসিয়ে দিয়েছিলেন। আমি জানি না এই ঘটনার সঙ্গে বারি কীভাবে জড়িত হয়েছিলেন। তবে বারি বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি যখন ঘোষণাপত্রে সই করেন, তখন তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালকও সেখানে ছিলেন।’
বাংলাফ্যাক্ট হচ্ছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর ফ্যাক্টচেক, মিডিয়া রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস টিম। তারা নিয়মিত ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই করে সঠিক তথ্য তুলে ধরে এবং গণমাধ্যম বিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করে।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা ইতোমধ্যে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া শত শত ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে এবং গুজব, অপতথ্য ও ভুয়া খবর প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে।