বাসস
  ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৭:১৩
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৮:২৩

গবেষণায় উঠে এলো ঘরে ফল-সবজি সংরক্ষণের ভুলে নষ্ট হচ্ছে পুষ্টিগুণ

ছবি : বাসস

মো. তানভীর হায়াত খান

নেত্রকোণা, ৮ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশে ঘরোয়া পর্যায়ে ফল ও সবজি সংরক্ষণের ভুল পদ্ধতির কারণে একদিকে যেমন খাদ্য অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে আশঙ্কাজনকভাবে নষ্ট হচ্ছে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘জার্নাল অফ এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড রিসার্চ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

এ গবেষণায় প্রধান গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন, বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান), আঞ্চলিক কার্যালয়, নেত্রকোণার উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোসা. আলতাফ-উন-নাহার এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ময়মনসিংহ-এর হর্টিকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারে বাজার থেকে কেনা সবুজ মরিচ, পেয়ারা ও টমেটো সাধারণত ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখা হয়। কিন্তু এই অভ্যাসের ফলে পুষ্টিগুণ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 

গবেষকগণ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (প্রায় 25±2°  সেলসিয়াস) এবং রেফ্রিজারেটরের ঠান্ডা পরিবেশের (6±1° সেলসিয়াস) মধ্যে তুলনা করে দেখেছেন যে, ঘরের তাপমাত্রায় মাত্র ২ দিনের মধ্যেই ফল-সবজির ওজন ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। বিপরীতে, রেফ্রিজারেটরে একই সময়ে এই ওজনের ক্ষয় ৫ শতাংশের নিচে থাকে।

গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভুল সংরক্ষণ পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভিটামিন-সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। উদাহরণস্বরূপ, পেয়ারা ঘরের তাপমাত্রায় রাখলে এর ভিটামিন-সি প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। অথচ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করলে প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভিটামিন-সি বজায় থাকে। একইভাবে টমেটো ও সবুজ মরিচের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও রঙের গুণাগুণ ঘরের তাপমাত্রায় দ্রুত হ্রাস পায়। যদিও ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাসের মতো খনিজ উপাদানগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে, তবে সামগ্রিক খাদ্যমান রক্ষায় ঠান্ডা সংরক্ষণই সবচেয়ে কার্যকর।

গবেষকগণ আরও লক্ষ্য করেছেন যে, ফল বা সবজি যত বেশি শক্ত ও সতেজ থাকে, তার পুষ্টি উপাদান তত বেশি সংরক্ষিত থাকে। সবজি ও ফলের শক্তভাব (firmness) কমার সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিন-সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দ্রুত কমতে শুরু করে। এটি শুধু বাহ্যিক মান নষ্ট হওয়া নয়, বরং ভেতরের পুষ্টিগুণ হ্রাসেরও ইঙ্গিত।

পুষ্টিগুণের বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা হলে এই ফল ও সবজিগুলোয় প্রায় ৮ দিন পর্যন্ত পুষ্টিমান সংরক্ষিত থাকে, যেখানে ঘরের তাপমাত্রায় তা গড়ে মাত্র ২ দিন স্থায়ী হয়। তাই পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফল ও সবজি কেনার পর দীর্ঘ সময় বাইরে না রেখে সঠিকভাবে রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে রেফ্রিজারেটরে রাখলেও তা যতটা সম্ভব কম সময়ের মধ্যে খেয়ে নেওয়া উত্তম বলে জানান তারা।

গবেষণাটি সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে বলছে যে, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা কেবল মাঠেই নয়, বরং রান্নাঘর থেকেও শুরু হয়। সামান্য সচেতনতা ও সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় রোধ করা সম্ভব, তেমনি দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ফলিত পুষ্টি গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বারটান) এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোসা. আলতাফ-উন-নাহার বাসসকে জানান, বাংলাদেশে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থাপনার কথা প্রায়ই উঠে আসে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দীর্ঘদিন অবহেলিত রয়ে গেছে, আর তা হলো ঘরোয়া পর্যায়ে খাদ্য সংরক্ষণ ও অপচয়। গবেষণায় দেখা যায়, দেশে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় ২৩-২৫ শতাংশ ভোক্তা পর্যায়ে অপচয় হয়, যার বড় অংশ ঘটে পরিবারের রান্নাঘরেই। এই অপচয়ের বড় ভুক্তভোগী হলো ফল ও সবজি, যেগুলো পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে দ্রুত পুষ্টিগুণ হারাতে থাকে।

তিনি আরও জানান, ঘরে ফল ও সবজি সংরক্ষণ ও অপচয় কমাতে এবং জনগণের পুষ্টিস্তর উন্নয়নে পুষ্টিমান সংরক্ষিত রেখে ফল ও সবজি সংরক্ষণের ওপর একটি বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। বাংলাদেশে পুষ্টি নিরাপত্তা, বিশেষ করে ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ঘাটতি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। অথচ এই গবেষণা দেখাচ্ছে—উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ঘরোয়া সংরক্ষণ পদ্ধতি উন্নত করলে উল্লেখযোগ্যভাবে পুষ্টি সংরক্ষণ সম্ভব।
এক্ষেত্রে নীতিগতভাবে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচিতে ঘরোয়া খাদ্য সংরক্ষণ নির্দেশিকা অন্তর্ভুক্ত করা, কৃষি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং স্কুল পাঠ্যক্রমে খাদ্য অপচয় ও সংরক্ষণ শিক্ষা যুক্ত করা প্রয়োজন।

একই বিষয়ে একমত পোষণ করে অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বাসসকে জানান, "খাদ্য অপচয় কমানো মানেই মূলত দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার ভিত মজবুত করা। অপচয় রোধ করার মাধ্যমে আমরা কেবল খাদ্য সাশ্রয় করছি না, বরং খাবারের অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদানগুলোকেও সুরক্ষিত করছি।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে খাদ্য আমদানি করা হয়, অথচ ঘরে সঠিকভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খাদ্য সংরক্ষণ করতে পারলে এই বিপুল অপচয় রোধ করা সম্ভব। এটি একদিকে যেমন পরিবারের প্রতিটি সদস্যের দৈনিক পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে, অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদনের চাপ ও আমদানি নির্ভরতা কমাতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তাঁর মতে, পুষ্টিমান অক্ষুণ্ন রেখে খাদ্য সংরক্ষণ করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সাশ্রয়—উভয়ই নিশ্চিত করা সম্ভব।"