শিরোনাম

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান
খুলনা, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : খুলনা অঞ্চলের লবণাক্ত পতিত জমির বিস্তীর্ণ অংশ এখন সূর্যমুখী ফুলের রঙে সোনালি হয়ে উঠেছে। উপকূলীয় অঞ্চল এবং নিম্নাঞ্চলে সফল চাষের পর, সূর্যমুখী চাষ জেলার ভোজ্য তেলের চাহিদা মেটাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে।
কম উৎপাদন খরচ, স্বল্প চাষের সময় এবং সরকারি প্রণোদনা কৃষকদের কৃষি জমির পরিমাণ বাড়াতে উৎসাহিত করেছে। ফলে কৃষকরা নতুন সম্ভাবনার আশা দেখছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুসারে, খুলনা অঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল এবং সাতক্ষীরা জেলায় চলতি মৌসুমে ১ হাজার ২১৯ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। যা গত বছরের ১ হাজার ১০৮ হেক্টর থেকে ১১১ হেক্টর বেশি। চলতি (২০২৫-২৬) মৌসুমে ১ হাজার ৩১৯ হেক্টর জমিতে ২ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন সূর্যমুখী উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৯২ শতাংশ সূর্যমুখী চাষ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ৫৫০ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১৯৭ হেক্টর অর্থাৎ ৩৬ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে। বাগেরহাটে ৫৩৮ হেক্টর জমির বিপরীতে ৬০৩ হেক্টর অর্থাৎ ১১২ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে। সাতক্ষীরায় ১১৪ হেক্টর জমির বিপরীতে ২২৮ হেক্টর অর্থাৎ ২০০শতাংশ জমিতে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে এবং নড়াইলে ১১৭ হেক্টর জমির বিপরীতে ১৯১ হেক্টর অর্থাৎ ১৬৩ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে।
কর্মকর্তারা আশা করছেন, সূর্যমুখী ফলে খুলনা অঞ্চলে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার (প্রতি মেট্রিক টন ৪০০ লিটার) লিটার ভোজ্যতেল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। যা প্রায় ৩ কোটি মানুষের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করবে এবং আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে ভূমিকা রাখবে।
সরেজমিনে জেলার ডুমুরিয়ায় মডেল মসজিদ সংলগ্ন ক্ষেত পরিদর্শনে দেখা যায়, হলুদ কার্পেটের মতো বিশাল এক বিস্তৃত সূর্যমুখী ফুলের বাগান। যেখানে বাতাসে মৃদুভাবে দোল খাচ্ছে সূর্যমুখী ফুল।
কৃষক আব্দুল হক বাসসকে বলেন, সূর্যমুখী চাষের মূল লক্ষ্য হলো তেল উৎপাদন। আমরা প্রতি বিঘায় সাত থেকে দশ মণ বীজ পাই। প্রতি কেজি বীজ থেকে কমপক্ষে আধা লিটার তেল বের করা যায়। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় প্রায় ১৪০ থেকে ২০০ লিটার তেল উৎপাদন করা যায়।
তিনি বলেন, বর্তমানে সূর্যমুখী তেল প্রতি লিটারে সর্বনিম্ন ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেখানে প্রতি বিঘায় চাষের খরচ ৩ হাজার ৫০০ টাকা। তেল ছাড়াও বীজের খোসা পুষ্টিকর গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন বলেন, লবণাক্ত জমিতে অনেক ফসল ভালো ফলন না দিলেও সূর্যমুখী তুলনামূলকভাবে ভালো ফলন দেয়। ফসলে কম সেচ এবং তেমন যত্নের প্রয়োজন হয় না। যার কারণে সূর্যমুখী চাষে আরও বেশি কৃষক আগ্রহী হয়ে উঠছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাজমুল হুদা সূর্যমুখীকে একটি প্রতিশ্রুতিশীল তৈলবীজ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ, উন্নতমানের বীজ এবং সার সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি ডুমুরিয়ার কৃষকদের সূর্যমুখী চাষ আরও সম্প্রসারণের জন্য সরকারি ক্রয় এবং শক্তিশালী বাজার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।
তিনি বলেন, দেশের ভোজ্যতেলের একটি বিরাট অংশ আমদানি-নির্ভর। এ অবস্থায় সূর্যমুখীর উৎপাদন বৃদ্ধি আমদানি চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
খুলনা অঞ্চলের ডিএই-এর অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বাসসকে বলেন, এই মৌসুমে ১০ হাজার ৬৫০ জন কৃষককে প্রণোদনা সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। চাষাবাদকে উৎসাহিত করার জন্য ২ লাখ ১৩ হাজার কেজি সার এবং ১০ হাজার ৬৫০ কেজি বীজ বিতরণ করা হয়েছে। জনপ্রতি কৃষকরা ২ বিঘা জমির জন্য ১০ কেজি ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার, ১০ কেজি মিউরেট অফ পটাশ (এমওপি) এবং ১ কেজি বীজ পেয়েছেন। এছাড়াও এই অঞ্চলের চার জেলায় কৃষক এবং ডিএই-এর সহযোগিতায় চাষাবাদ করা প্যাটনের প্রকল্পের আওতায় মোট ২৪০ জন কৃষক ৮০ একর জমিতে ৪০টি সূর্যমুখী ক্ষেত প্রদর্শন করছেন। ২৪০ জন কৃষক সরকারের কাছ থেকে বারি-৩ সূর্যমুখী বীজ, ডিএপি এবং এমওপি সার এবং কীটনাশক পেয়েছেন। এখন খুলনা অঞ্চলের চারটি জেলার ক্ষেত কৃষ্ণচুড়ার সোনালি আভায় হলুদ রঙে জ্বলজ্বল করছে।
তিনি বলেন, সূর্যমুখী কেবল একটি ফুল নয় বরং এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।