শিরোনাম

ঢাকা, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : সারা দেশের মতো ঢাকার জনজীবনেও নেমে এসেছে শীত। ভোরের আলো ফোটার আগেই কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। হাল্কা রোদ উঠলেও তেমন কোনো তেজ নেই, খানিক পরেই সূর্যটা লুকিয়ে যায়। শীতের এই উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর পুরান ঢাকা, গুলিস্তান ও পল্টনের ফুটপাত জুড়ে শুরু হয়েছে মৌসুমি শীতবস্ত্রের জমজমাট বেচাকেনা।
প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ফুটপাতে পসরা সাজানো নানা ধরনের শীতের পোশাক। জ্যাকেট, কোট, সোয়েটার, মাফলার, জুতা-মোজা, হুডি, কানটুপি, কম্বল, শাল, কমফোর্টার, হ্যান্ডগ্লাভসসহ মিলছে ফুটপাতের এসব দোকানে। তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাওয়ায় নিন্মবিত্ত, নিন্ম মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কাছেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এই দোকানগুলো।
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা পুরানা পল্টন, মতিঝিল, গুলিস্তান, লক্ষ্মীবাজার, নয়াবাজার ও সদরঘাট এলাকার বিভিন্ন সড়কের পাশে ফুটপাতে সাজানো হয়েছে শীতবস্ত্রের পসরা। দোকানগুলোতে রয়েছে শীতের নানা ধরনের বাহারি পোশাক। এখানে ৫০ টাকার মাফলার থেকে শুরু করে হাজার টাকার হুডি বা কম্বল সব ধরনের পোশাকই পাওয়া যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরানা পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় বিভিন্ন কাজে আসা মানুষ ও অফিস ফেরত কর্মজীবীরা রাস্তার পাশের ফুটপাতের দোকানগুলোতে শীতের পোশাক দেখছেন। অফিসপাড়া হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় সকাল থেকেই কোট, জ্যাকেট, হুডি ও সোয়েটার হাতে কর্মজীবী মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিক্রেতারা জানান, অফিসগামী মানুষই তাদের প্রধান ক্রেতা। পাশাপাশি হাঁটা ক্রেতারাও নিয়মিত আসছেন। দাম তুলনামূলক কম ও সহজলভ্য হওয়ায় ফুটপাতের দোকানেই বেশি ভরসা করছেন ক্রেতারা।
পল্টনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বাসসকে জানান, অফিসে যাওয়ার পথে প্রায়ই ফুটপাতের দোকানগুলো ঘুরে দেখেন। গত সপ্তাহে এখান থেকেই ১ হাজার ৫০০ টাকায় একটি জ্যাকেট কিনেছেন। তিনি বলেন- ‘শপিং মলে গেলে একই জিনিসের দাম দ্বিগুণ হতো। এখানকার জিনিসের মান অনুযায়ি দামটাও মোটামুটি ভালো। তাছাড়া দর কষাকষির সুযোগ থাকে এবং সময়ও বাঁচে।’
তবে অন্যান্য ক্রেতাদের অভিযোগও কম নয়। কেউ কেউ বলছেন, সব পণ্যের মান একরকম নয়, দেখে শুনে কিনতে হয়। তবুও শীতের মৌসুমে মধ্যবিত্ত অফিসজীবীদের জন্য পুরানা পল্টন যেন এক ভরসার বাজার। সীমিত আয়ের মধ্যে প্রয়োজন মেটাতে এই এলাকার শীতের জামাকাপড়ের দোকানগুলো প্রতিদিনই হয়ে উঠছে কর্মজীবী মানুষের নিত্যদিনের ঠিকানা।
পুরান ঢাকায় বাহাদুর শাহ পার্ক সংলগ্ন কবি নজরুল কলেজের সামনে থেকে শুরু করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ পর্যন্ত ফুটপাতে জমে উঠেছে শীতের পোশাকের বাজার। বিকেল থেকেই এখানকার বিক্রি শুরু হয়।
কবি নজরুল কলেজের বিপরীতে শীতের কাপড় বিক্রেতা মোহাম্মদ রশিদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বাসসকে জানান, কয়েকদিন ধরে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতার সংখ্যাও বেড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অফিস ফেরত মানুষ ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা বেশি আসেন। তিনি বলেন- আমরা মূলত জ্যাকেট, সোয়েটার, হুডি ও মাফলার বিক্রি করি। বড় দোকানের তুলনায় ফুটপাতের বাজারে কম দামে শীতের কাপড় পাওয়া যায় বলে মধ্যবিত্ত ও স্বল্পআয়ের মানুষ বেশি আসেন।
মহানগর মহিলা কলেজের সামনে ফুটপাতে শিশুদের শীতের কাপড় বিক্রি করেন মো. সরওয়ার। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে শীত শুরু হওয়ায় মানুষ অল্প অল্প করে শীতের কাপড় কিনছিল। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে শীত বাড়তে থাকায় ক্রেতাও বেড়েছে। সামনে শীতের তীব্রতা বাড়লে বিক্রি আরও বাড়বে বলে মনে হচ্ছে। বর্তমানে শিশুদের পোশাকের চাহিদাই বেশি।
সদরঘাটের লঞ্চযাত্রী আবদুল করিম লক্ষ্মীবাজারে শীতের কাপড় কিনতে এসে বাসসকে বলেন, গ্রাম থেকে ঢাকায় এলে একসঙ্গে কয়েকটা কাজ সেরে নিই। শীত পড়ছে, তাই এখান থেকেই নিজের ও পরিবারের জন্য দু’-একটা শীতের কাপড় কিনে নেব। এখানে দাম তুলনামূলক কম, দরদামও করা যায়। লঞ্চে ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া সহজ।

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তানে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। ‘ব্যাইছা লন- একশ’, ‘দেইখ্যা লন- একশ’ এমন ডাকাডাকির সঙ্গে চলছে শীতের পোশাক বিক্রি। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পোশাক কিনতে এসব দোকানে ভিড় জমাচ্ছেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর-পশ্চিম গেটের সামনে, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ হকার্স সমিতি মার্কেট ও গুলিস্তান মোড়ের আশপাশের ফুটপাতগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমে বেশ জমে উঠেছে বাজার।
গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের পূর্ব দিকে টি-শার্টের দোকান বসিয়েছেন জহির উদ্দিন। তিনি বাসসকে বলেন, অনেকেই ভারী জ্যাকেট না কিনে ফুলহাতা টি-শার্ট ও পাতলা সোয়েটার কিনছেন। বিশেষ করে তরুণ ও অফিসগামী লোকজন এই দিকটায় বেশি আসেন।
গুলিস্তানে কেনাকাটা করতে আসা পোশাক শ্রমিক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বাসসকে জানান, কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে ভোর ও রাতের ঠান্ডা বেশি অনুভূত হয়। বেশি গরম নয়, এমন একটা সোয়েটার খুঁজছিলাম, যেটা কাজের সময় পরা যাবে। এখানে কম দামে ভালো পোশাক পাওয়া যায়, তাই বন্ধুর সঙ্গে এসেছি।