শিরোনাম

শাহজাহান নবীন
ঝিনাইদহ, ২ এপ্রিল ২০২৬ (বাসস): জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে ঝিনাইদহে সাময়িক সংকট দেখা দিয়েছে। ফসলি জমির সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জেলায় ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। একই সাথে জেলার সব এলাকায় সেচ পাম্পের জ্বালানি ডিজেলের সরবরাহ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিলে চলতি আবাদি মৌসুমে জেলার ফসল উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৬টি উপজেলায় ৫১ হাজার ৫৪২টি ডিজেল চালিত সেচ পাম্প রয়েছে। এসব পাম্প দিয়ে জেলার প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ৪৩২ হেক্টর জমির সেচ কাজ পরিচালনা করা হয়। কৃষকরা নিজ উদ্যোগে এসব সেচ পাম্পের মাধ্যমে আবাদি জমিতে সেচ করে থাকেন। ডিজেলের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমির ফসল উৎপাদন ও ফলনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গত কয়েকদিন সরেজমিনে জেলা শহরসহ অন্যান্য এলাকার তেল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ডিজেল সংগ্রহ করছেন কৃষকরা। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরে কৃষকরা সীমিত পরিমাণে ডিজেল পাচ্ছেন।
কৃষকরা জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্তিক বাজারের ‘ড্রামে জ্বালানি তেল বিক্রয়ের অনুমোদিত’ ব্যবসায়ীরা ডিজেল বিক্রি করতেন। চলমান পরিস্থিতিতে ওই সব ব্যবসায়ীরা ডিপো থেকে ডিজেল পাচ্ছেন না। ফলে শহর ও শহরের পার্শ্ববর্তী ফুয়েল স্টেশনে ডিজেলের জন্য কৃষকদের উপস্থিতি বাড়ছে। এতে করে কৃষকদের ডিজেল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পাম্পগুলো।
জেলা ফুয়েল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম বাসসকে জানান, জেলা শহর ও আশেপাশে প্রায় ১৪টি তেল পাম্প রয়েছে। তবে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জেলার পাম্পগুলো ডিপো থেকে আগের মতো তেল পাচ্ছে না। ফলে একই সাথে একাধিক পাম্পের একযোগে তেল সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন ধাপে ধাপে গড়ে ৬ থেকে ৭টি তেল পাম্প থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে পাম্পগুলোতে বাড়ছে গ্রাহকের অস্বাভাবিক চাপ।
পাম্প মালিকরা জানান, খুলনাসহ অন্যান্য ডিপো থেকে পাম্পগুলোতে চাহিদার অর্ধেক ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। প্রাপ্ত ডিজেল প্রতিটি পাম্পের সঙ্গে নির্ধারিত মাসিক চুক্তিভিত্তিক যানবাহন, সাধারণ যানবাহন ও সেচ কাজের জন্য কৃষকদের মাঝে সীমিত পরিমাণে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সদর উপজেলার বৈডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মোমিনুল ইসলাম বাসসকে বলেন, সেচ পাম্প চালাতে দিনে ৪ থেকে ৫ লিটার ডিজেল লাগে। এখন পাম্পে গেলে ২ থেকে ৩ লিটার ডিজেল দিচ্ছে। এতে করে সেচ পাম্প দিনের যে-কোনো একবেলা চালাতে পারছি। কয়দিন পরেই ধানের বাইল (ডগা/ছড়া) বের হবে। জমিতে এখন সেচের মাধ্যমে পানির প্রয়োজন। দুই বেলা সেচ পাম্প চালাতে না পারলে ধান সহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ও ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শৈলকূপা উপজেলার কচুয়া গ্রামের কৃষক সুশান্ত বিশ্বাস বলেন, পেঁয়াজ আবাদের পরে একই জমিতে আমরা পাট বপন করি। কিন্তু ডিজেল না পেলে পাট আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে যাবে। এ ছাড়া যথাসময়ে পানি সেচ দিতে না পারলেও ধানের ফলন খারাপ হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ঝিনাইদহ জোনের সহকারী প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ) সৌরভ কুমার বিশ্বাস বাসসকে জানান, জেলায় মোট ৫৯ হাজার ৪৯১ টি সেচপাম্পের মাধ্যমে ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়ে থাকে। এরমধ্যে জেলায় ডিজেল চালিত স্যালো ইঞ্জিন সেচ পাম্প (গভীর ও অগভীর নলকূপ) রয়েছে ৫১ হাজার ৫৪২টি। যা দিয়ে জেলার মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৪৩২ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। এ ছাড়া জেলায় মোট ৩৭ হাজার ৩০৮ হেক্টর জমিতে ৭ হাজার ৯৪৯ টি বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে পানি সেচ দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই কৃষকরা ডিজেল চালিত এসব অগভীর নলকূপের মাধ্যমে তাদের কৃষি জমিতে সেচ দিয়ে থাকেন।
ঝিনাইদহ ফুয়েল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম বলেন, ডিপো থেকে পাম্পগুলোতে চাহিদা মতো তেল দেওয়া হচ্ছে না। তারপরও এখন পর্যন্ত ডিজেলের সরবরাহ বেশ স্বাভাবিক আছে। কৃষকরা পাম্পে এলে ডিজেল পাচ্ছেন। আশা করছি, ডিজেলের সরবরাহে আগামী কয়েক সপ্তাহে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
উল্লেখ্য, জেলায় মোট ৩৬টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৬টি, শৈলকূপায় ৫টি, হরিণাকুণ্ডুতে ১টি, কালীগঞ্জ উপজেলায় ৮টি, কোটচাঁদপুরে ৩টি এবং মহেশপুর উপজেলায় ৩টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। তবে গড়ে প্রতিদিন জেলায় গড়ে মোট ৬/৭টি পাম্প থেকে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।