বাসস
  ২১ জুন ২০২৬, ১৯:৪৪

ভোলা উপকূলের সাগরে মিলছেনা ইলিশ, নদীতে মিলছে বড় বড় ইলিশ

ছবি : বাসস

আল-আমিন শাহরিয়ার

ভোলা, ২১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : জেলার সাগরগামী জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে হতাশ হয়ে কূলে ফিরে আসছেন। মাছের সুষ্ঠ প্রজনন, সংরক্ষণ ও আহরণে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে যে পরিমাণ মাছ পাবার কথা, তা পাচ্ছেননা জেলেরা। 

অন্যদিকে সাগরে মাছ না পাওয়া গেলেও উপকূলীয় ভোলার নদ-নদীগুলোতে আশানুরূপ ইলিশ ও নানা প্রজাতির মাছ পেয়ে খুব খুশী জেলেরা। এখানকার নদীগুলোতে জেলেদের জালে এখন বড় আকারের (রাজা) ইলিশ মিলছে। এসব ইলিশ আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের বলে জানিয়েছেন জেলেরা। যেগুলোর দাম হাঁকানো হচ্ছে-প্রতি কেজি তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণ নিশ্চিতে প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ জলসীমায় সব ধরনের মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে। এবারের নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারের তরফ থেকে জেলেদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়, তবে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সমুদ্রে মাছের জোগান স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মিলছে না বলে ভোলা উপকূলের জেলেরা হতাশ।

এরই মধ্যে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভোলার বঙ্গপোসাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় হাজার হাজার মাছধরা ট্রলার নিয়ে  জেলেরা উপকূলের বিভিন্ন নদীর ঘাটে আশ্রয় নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১১ জুন মধ্যরাতে সরকারি ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ভোলা উপকূলের বিভিন্ন ঘাট থেকে কয়েকশত ট্রলার মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে গভীর সমুদ্রে যায়। তবে অধিকাংশ ট্রলারের জেলেরা কাক্সিক্ষত পরিমাণ মাছ না পেয়ে কূলে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। এরমধ্যে কয়েকদিন ধরে সাগরে বিরূপ আবহাওয়া ও প্রবল ঢেউয়ের কারণে মাছ ধরা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

আজ রোববার সকালে জেলার বিভিন্ন মাছঘাটে সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলেদের জীবনমানের ভিন্ন চিত্র। 

সাগর হতে একের পর এক ট্রলার প্রায় মাছশূন্য অবস্থায় ফিরে ভোলার চরফ্যাশনের কচ্ছপিয়া, সামরাজ মৎস্য বন্দর, লালমোহনের মেঘনাঘাট মঙ্গল সিকদার ঘাট, বোরহানউদ্দিনের হাকিমুদ্দিনের মেঘনা মৎস্য ঘাট, ভোলা সদরের তুলাতুলি ও নাছির মাঝি ঘাটে নোঙর করে আছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাগর মোহনার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ জনপদ মনপুরার রাম নেওয়াজ, হাজির হাট, সাকুচিয়া ও পঁচা কোড়ালিয়া নদীর ঘাটেও সাগর ফেরৎ অসংখ্য মাছধরা ট্রলার ভিড়ে আছে। 

সেখানকার জেলেরা জানান, দীর্ঘদিন মাছ আহরণে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের মধ্যে এখন হতাশা বিরাজ করছে। 

অনেকেই নতুন করে ঋণ ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন।

চরফ্যাশন সামরাজ মৎস্য বন্দরের ট্রলার মালিক বশির আহমেদ মাঝি, সালাম সিকদার, রফিজল মাঝি ও কালাম সর্দারের সাথে কথা হয়। তাদের সবার মুখেই মাছ না পাবার আক্ষেপ আর পাহাড়সম হতাশার যন্ত্রণা। 

তারা বলেন,‘নিষেধাজ্ঞা শেষে অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু কয়েকদিন ধরে ঘাম ঝড়িয়ে জাল ফেলে শত পরিশ্রম করেও কাক্সিক্ষত পরিমাণ মাছ মিলেনি। এখন জেলে ও ট্রলারগুলো নিয়ে নদীর ঘাটে আশ্রয় নিয়েছি’। 

ভোলা সদরের তুলাতুলি মৎস্যঘাটের ট্রলার মালিক সাহাবুদ্দিন ও মোশারেফ হোসেন জানান, নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে সব শ্রেণির মাছের উৎপাদন বাড়ার কথা থাকলেও সাগরে গিয়ে বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। তারা বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় কিছু অসাধু জেলে ও বড় ট্রলিং ট্রলার সিন্ডিকেট সাগরে ব্যাপকহারে মাছ নিধন করে নিয়ে গেছে, আর এ কারণেই মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণ বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে। 

সাগরমুখী ভোলা উপকূলের প্রান্তিক জেলেরা বাসস'কে বলেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে আমরা ক্ষুদ্র জেলেরা নিয়ম মেনে বাড়িতেই বসেছিলাম, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার সময় অসাধু একটি বিশেষ চক্র সমুদ্রকে মাছশূন্য করেছে। ফলে এখন আমাদেরই এর মাশুল গুনতে হচ্ছে।

এসব অসাধু মৎস্য লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইনী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তারা। জেলেরা বলেন, সাগরে ট্রলার নামাতে আমাদেরকে মোটাদাগের ঋণ নিতে হয়েছে। মাছ না পাওয়ায় সেই ঋণ শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাছাড়া সন্তানদের ভরণপোষণ চালানোরও কোনো মাধ্যম খুঁজে পাচ্ছিনা।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বাসস'কে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞাকালে জেলেদের জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিয়ে থাকে। তবে বর্তমানে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য আলাদাভাবে বিশেষ কোনো সরকারি সহায়তা কর্মসূচি নেই।’ জলমহালভিত্তিক কর্মকা- বা অন্যান্য উৎপাদনমুখী উদ্যোগের মাধ্যমে বৈরী আবহাওয়ার সময় তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে ভোলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। এ কারণে ছোট নৌযান ও মাছধরা ট্রলারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

মৎস্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাগরের আবহাওয়া অনুকূলে ফিরে আসা, অবৈধ মাছ শিকার বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে জেলেরা আবারও স্বাভাবিকভাবে মাছ আহরণ করে ফিরতে পারবেন।

এদিকে সম্প্রতি ভোলার মেঘনা, তেতুলিয়া, কালাবাদর, বুড়া গৌরাঙ্গ ও ইলিশা নদীতে জেলেদের জালে বড় মাপের রাজা ইলিশ ধরা পড়ছে। জেলেরা জানান, অন্য মৌসুমের চাইতে এবার মৌসুমে নদীতে সন্তোষজনক ইলিশ পাচ্ছেন তারা। 

ভোলার শিবপুর মাছঘাটের আড়ৎদার মিজান মাঝি,তরিকুল ইসলাম ও নান্নু মাঝি বাসস'কে জানান, জেলেদের জালে রাজা ইলিশের পাশাপাশি ১ কেজি, দেড়কেজি ও ৮ শ' গ্রাম ওজনের ইলিশ অহরহ ধরা পড়ছে। প্রচুর ইলিশ ধরা পড়লেও এগুলোর দাম খুব বেশি বলেও জানান তারা। 

গতকাল শনিবার জেলার মনপুরা উপজেলায় বড় আকারের একটি রাজা ইলিশ ধরা পড়ায় মাছঘাট সরগরম হয়ে উঠে। মাছটির ওজন ২ কেজি ৪০০ গ্রাম। সেখানকার আড়তদারদের দাবি, মাছটির বয়স অন্তত তিন বছর হবে। ওই রাজা ইলিশটি ৮ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। 

মৎস্য সংশ্লিষ্টরা জানান, গতকাল শনিবার ভোরে মনপুরা উপজেলার কলাতলীর চর এলাকার আবাসন খাল-সংলগ্ন মেঘনা নদী থেকে জেলে কামাল মাঝির জালে ইলিশটি ধরা পড়ে। পরে মাছটি আনা হয় মনপুরার রামনেওয়াজ মৎস্যঘাটে। ঘাটে বড় আকৃতির ইলিশটি ওঠার পর স্থানীয় ব্যবসায়ী, জেলে ও কৌতূহলী মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

ওই মৎস্যঘাটের ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন মাঝি বলেন, মাছটি তার আড়তে আনার পর নিলাম হয়। নিলামে রাজা ইলিশটি ৮ হাজার ১শ' টাকায় বিক্রি হয়।

ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইন বাসস'কে বলেন, বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ার পেছনে জৈবিক ও মৌসুমি ব্যাখ্যা আছে। তার ভাষ্যানুযায়ী, এ ধরনের মাছ সাধারণত বয়সে বড় হয়; ধরা পড়া এই মাপের ইলিশের বয়স দুই বছরের বেশি, এমনকি তিন বছরের কাছাকাছিও হতে পারে। তিনি জানান, মাছটির পেটে ডিম ছিল। এটি ডিম ছাড়ার প্রস্তুতিতে নদীর ভেতরের দিকে উঠে আসা মাছ হতে পারে। 

তিনি বলেন, ইলিশ সারা বছরই ডিম দিতে পারে। তবে ভাদ্র-আশ্বিনে বৃষ্টিপাত বাড়লে এবং, নদীর পানির উচ্চতা ও স্রোত বৃদ্ধি পেলে এই শ্রেণির ইলিশ দলবদ্ধ হয়ে নদীতে আসে। তখন ডিম ছাড়ার প্রবণতাও বাড়ে।

ভোলার মাছ ব্যবসায়ী, জেলে ও আড়ৎ মালিকগণ মনে করেন,জলবায়ুর প্রভাব কিম্বা অসাধুচক্রের নিধনকর্মের কারনেই হোক না কেনো, সাগরে মাছ না মিললেও নদীর ইলিশ আহরণের মাধ্যমে জেলেরা তাদের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নিতে পারবেন।