শিরোনাম

দিনাজপুর, ১০ মে, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিডব্লিউএমআরআই) চলতি মৌসুমে দেশব্যাপী কৃষকদের মধ্যে নতুন উদ্ভাবিত পাঁচটি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত বিতরণ করেছে।
নতুন জাতগুলো বর্তমান আবহাওয়ায় দেশজুড়ে উৎপাদন করতে সক্ষম, যা দেশের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে।
বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিডব্লিউএমআরআই-এর জনসংযোগ পরিচালক আবদুল হাকিম বলেন, বাংলাদেশে গমের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮০ থেকে ৮২ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে স্থানীয় উৎপাদন মাত্র ১০ থেকে ১২ লাখ মেট্রিক টন।
তিনি বলেন, প্রতি বছর ২৪ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন গম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গম চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করতে নতুন ৫টি অধিক ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করছে দিনাজপুর গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। নতুন উদ্ভাবন করা গমের জাত গুলোর উৎপাদন দ্বিগুণ ও ফলন পাওয়া যাবে অধিক। এই জাত গুলো স্বল্প মেয়াদি, তাপ-লবণাক্ততা ও খরা সহিষ্ণু এবং ব্লাষ্টসহ বিভিন্ন রোগ ও পোকা-মাকড় প্রতিরোধী ও জিংক সমৃদ্ধ রয়েছে। জাতগুলো সম্প্রসারিত হলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে উৎপাদন। গত ৫ বছরে এই উচ্চ ফলনশীল ৫টি নতুন জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৮টি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করা হয়।
দিনাজপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গমের চলতি মৌসুমের শুরুতে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত নতুন ৫টি নতুন জাতের গমের বীজ প্রদর্শনী ও প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। সারা দেশের ৫ হাজার ৩০০ জন কৃষকের মাঝে বীজ গুলো গম চাষ মৌসুমের শুরুতে বিতরণ করা হয়েছিল। কৃষকের মাঠে আবাদের জন্য অনুমোদন দেওয়া নতুন ৫টি জাতের উৎপাদন হেক্টর প্রতি সাড়ে ৫ টন থেকে ৬ টন, যা অন্য জাত গুলোর চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। সব গুলোই স্বল্প মেয়াদি সময়ে উৎপাদনশীল।
ফলে একই জমিতে বছরে ৩ থেকে ৪টি ফসল সহজে উৎপাদন করা যায়। পাশাপাশি এসব জাত স্বল্প মেয়াদি, তাপ-লবণাক্ততা ও খরা সহিষ্ণু, ব্লাষ্টসহ বিভিন্ন রোগ ও পোকা-মাকড় প্রতিরোধী এবং জিংক সমৃদ্ধ। এসব জাত গুলোর নামকরণ করা হয়েছে, বিডাব্লিউএমআরআই-১, বিডাব্লিউএমআরআই-২, বিডাব্লিউএমআরআই-৩, বিডাব্লিউএমআরআই-৪ এবং বিডাব্লিউএমআরআই-৫। এগুলো তাপ সহিষ্ণু, ব্লাষ্ট, পাতার দাগ ও মরিচা প্রতিরোধী, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম, হেলে পড়ে না, লবনাক্তসহ সর্বত্র আবাদের উপযোগী। নতুন উদ্ভাবন করা গমের জাতগুলো বিশেষভাবে লবণাক্ত এলাকায় চাষাবাদের উপযোগী।
এসব জাত আবাদ করে ভালো ফলন পেয়েছেন কৃষকরা। তারা বলছেন, নতুন জাতের গমগুলোর উৎপাদন খরচ কম, ফলন বেশি। পাশাপাশি রোগ বালাই ও পোকা-মাকড়ের আক্রমণ একেবারেই কম। ভালো ফলন ও লাভের মুখ দেখে, আগ্রহী হচ্ছেন অন্য কৃষকরাও। এজন্য নতুন জাতগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার দাবি তাদের।
দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর গ্রামের কৃষক মো. সায়েদ আলী বলেন, “এক সময় ইরি-বোরো ধানের আবাদ ছিল না, ভুট্টাও চাষ হতো না। তখন আমরা কৃষকেরা মূলত গম আবাদ করতাম। তবে সে সময় গমের ফলন ও উৎপাদন তুলনামূলক কম ছিল। আগে যেখানে ৫ বিঘা জমিতে গম চাষ করতাম, এখন করছি মাত্র ২০ শতাংশ জমিতে। তবে বর্তমানে এখানে উদ্ভাবিত নতুন নতুন গমের জাতের বীজ চাষ করেছি, যেগুলোর ফলন অনেক বেশি। স্বল্প সময়ে ও স্বল্প খরচে গম আবাদ করে লাভবান হয়েছি। তাই এসব নতুন জাতের গমের বীজ সব কৃষকের মাঝে সরবরাহের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।”
জেলার কাহারোল উপজেলার সদরপুর গ্রামের কৃষক মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘এখন অনেক উন্নত গমের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। আগের তুলনায় ফলন অনেক ভালো এবং রোগ-বালাইও কম। এবারে প্রচুর গমের আবাদ হয়েছে, আমরা কৃষকেরা লাভবান হচ্ছি। আগে প্রতি বিঘা (৪৮ শতাংশ) জমিতে ৫ থেকে ৮ মণ গমের ফলন হতো। এখন প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ২৮ মণ পর্যন্ত গম উৎপাদন হচ্ছে। নতুন জাতগুলো আবাদ করতে কৃষকেরা আগ্রহী। এসব বীজ সহজলভ্য হলে ধারাবাহিকভাবে গমের আবাদ অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে।’
বীরগঞ্জ উপজেলার সুজালপুর গ্রামের কৃষক মনছের আলী বলেন, ‘আমি ডায়াবেটিস রোগী, তাই প্রতিদিন রুটি খাই। এ কারণে নিজেই গম চাষ করি। বর্তমানে বাজারে গমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। নতুন জাতের গমগুলোর উৎপাদন বেশি হওয়ায় গম আবাদ ও বিক্রি করে আমরা লাভবান হচ্ছি। কারণ এসব জাতের গমে রোগ-বালাই কম, পোকা-মাকড়ের আক্রমণও খুব কম হয়। ফলে সার ও কীটনাশক তুলনামূলক কম ব্যবহার করতে হয়। এখন গম একটি উন্নত ও লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে। সব কৃষক যদি নতুন জাতগুলোর বীজ পায়, তাহলে সবাই লাভবান হবে। উন্নত জাতের গমের বীজ এখন খুব প্রয়োজন।’
দিনাজপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর মহাপরিচালক ড. মাহফুজ বাজ্জাজ বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চফলনশীল, রোগ ও ব্লাস্ট প্রতিরোধী ৫টি নতুন গমের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব জাত স্বল্প সময় ও স্বল্প দৈর্ঘ্যের হওয়ায় দ্রুত ফলন পাওয়া যায়। ফলে একই জমিতে বছরে ৩ থেকে ৪টি ফসল উৎপাদন করা সহজ হচ্ছে। গমের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ব্লাস্ট রোগ। নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলো ব্লাস্ট প্রতিরোধী, বিশেষ করে বিডব্লিউএমআরআই-৩ জাতটি অত্যন্ত ভালো। পাঁচটি জাতই জিংকসমৃদ্ধ এবং পুষ্টিমানও বেশি। নতুন জাতগুলোতে লবণাক্ত অঞ্চলে চাষাবাদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। পতিত জমিতেও এসব জাতের চাষ করা সম্ভব। এসব জাতের চাষাবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে বিদেশ থেকে গম আমদানির নির্ভরতা কমে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর দেশে গমের গড় ফলন ছিল প্রতি হেক্টরে ৩ দশমিক ৮৬ মেট্রিক টন। আর নতুন জাতগুলোতে ৫ থেকে ৬ মেট্রিক টন পর্যন্ত উৎপাদন হচ্ছে। এর মাধ্যমে গমের উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে পানির সংকট বেড়েছে, কিন্তু নতুন জাতের গম চাষে সেচ কম লাগে। ফলে চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও বরেন্দ্র অঞ্চলেও সহজে গম চাষ করা সম্ভব হবে। রোগ-বালাইয়ের দিক থেকেও গম একটি উৎকৃষ্ট ফসল। এতে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম হয় এবং এটি পরিবেশবান্ধব।’
এসব জাত ইতোমধ্যে কৃষকের মাঠে চাষের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এবারে কৃষকেরা ভালো ফলন পেয়েছেন। তাই বীজ উৎপাদন ও সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা নতুন জাত উদ্ভাবনে সফল হয়েছি। সীমিত পরিসরে বীজ উৎপাদন করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর মাধ্যমে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব জাত কৃষকের মাঠে ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশে গমের উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
নতুন জাতগুলোর সম্প্রসারণ হলে কৃষকেরা লাভবান হবেন, উৎপাদন বাড়বে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত। এতে দেশের গমের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। দেশে প্রতি বছর গমের চাহিদা বাড়ছে, তাই উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে ৫টি নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত ৩৮টি উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে।