শিরোনাম

গাজীপুর, ১০ মে, ২০২৬ (বাসস): গাজীপুরের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দ্রুত পদক্ষেপে গত শুক্রবার কাপাসিয়ায় নিহত একই পরিবারের পাঁচজনের মরদেহ আজ সকালে তাদের নিজ জেলা গোপালগঞ্জে দাফন করা হয়েছে।
নিহতদের মরদেহ আজ সকাল সাড়ে ৬টায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইক্কান্দি গ্রামে তাদের বাড়িতে পৌঁছায়। সকাল ১১টার দিকে পাইককান্দি পঞ্চপল্লী মাদ্রাসা মাঠে তাদের জানাজা শেষে স্থানীয় উত্তর চরপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এই সময় প্রশাসনের কর্মকর্তা, নিহতদের আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষ জানাজায় শরিক হন।
এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে নিহতরা হলেন : শারমিন খানম (৩৫), তার ভাই রসুল (২২), ফোরকান-শারমিন দম্পতির তিন কন্যা মিম (১৬), মারিয়া (৮) ও ফারিয়া (২)।
গতকাল সকালে পুলিশ কাপাসিয়া সদর উপজেলার রাউতকোনা পূর্বপাড়া গ্রামের একটি ভাড়া বাসা থেকে পাঁচজন নিহতের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ঘাতক ফোরকান মিয়ার গাড়ির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ আটকদের নাম প্রকাশ করেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের ভাষ্যমতে, অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া তার স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দেবরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার আগে ফোরকান তার মোবাইলে আত্মীয়দের কাছে হত্যাকাণ্ডরে কথা স্বীকার করে। ঘটনাস্থল থেকে কম্পিউটারে টাইপ করা বেশ কয়েকটি অভিযোগপত্র, চিরকুট, মদের বোতল ও মাদকসেবনের আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডর কারণে কাপাসিয়ায় যখন শোকের ছায়া নেমে আসে, তখন স্থানীয় প্রশাসন শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া দ্রুত ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার জন্য তৎপরতা চালান এবং নিহতদের মরদেহ গাজীপুর থেকে গোপালগঞ্জে আত্মীয়দের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
খবর পেয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন, কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না তাসনিম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক এবং জেলা প্রশাসনের দু’জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে পৌঁছে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন।
সাধারণত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেলা ২টার পর ময়নাতদন্ত বন্ধ থাকে। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতা এবং মরদেহগুলোর জখমের কারণে দ্রুত পচনের আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক স্বয়ং উদ্যোগী হন।
তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সাথে যোগাযোগ করে বিশেষ ব্যবস্থায় শনিবার রাতের মধ্যেই ৫ জনের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করেন।
মরদেহগুলো গোপালগঞ্জে নেওয়ার জন্য প্রথমে পিক-আপ ভ্যানের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ পথের কথা চিন্তা করে জেলা প্রশাসক ব্যক্তিগত তদারকিতে দু’টি অত্যাধুনিক ফ্রিজিং ভ্যানের ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, দাফন ও পরিবহন সংক্রান্ত যাবতীয় আর্থিক সহায়তার দায়ও তিনি নিজে বহন করার সুব্যবস্থা করেন বলে জানা গেছে।
শনিবার গভীর রাতে যখন নিহতদের মরদেহ নিয়ে ফ্রিজিং ভ্যান গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন সেখানে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রশাসনের এই মানবিক আচরণের প্রশংসা করেন। স্থানীয়দের মতে, একটি পরিবারের শোকাবহ এই কঠিন সময়ে জেলা প্রশাসনের এমন দ্রুত ও সংবেদনশীল পদক্ষেপ জনমনে আশার আলো সঞ্চার করেছে।
কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীনুর আলম বাসস-কে জানান, ‘প্রাথমিকভাবে পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া কাগজপত্র, মাদকসামগ্রী ও অন্যান্য আলামত গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পলাতক ফোরকান মিয়াকে গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।’
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সার্কেল) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশ, পিবিআই, ডিবি ও সিআইডি একযোগে কাজ করছে।’
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন বলেন, ‘একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
জেলা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, সিআইডি, পিবিআইসহ বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করছে। হত্যাকারী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে দু’জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আমরা আশাবাদী, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই মূল রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’