বাসস
  ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:৫৫

শেরপুরের চরাঞ্চলে দেশি চীনা বাদাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের 

শেরপুর সদরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে অধিক ফলনে দেশি চীনা বাদাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। স্বল্প খরচ ও কম পরিশ্রম এবং ভালো বাজার দরের কারণে দিন দিন বাদাম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন চরাঞ্চলের কৃষকরা। ছবি: বাসস

জাহিদুল খান সৌরভ

শেরপুর, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): শেরপুর সদরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে অধিক ফলনে দেশি চীনা বাদাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের। স্বল্প খরচ ও কম পরিশ্রম এবং ভালো বাজার দরের কারণে দিন দিন বাদাম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন চরাঞ্চলের কৃষকরা। এখানে উৎপাদিত বাদামের গুণমান ভালো হওয়ায় দেশব্যাপী এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এদিকে আবাদের পরিধি আরও বাড়াতে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ দেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শেরপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এ বছর ১২৬ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ১২৭ হেক্টর জমিতে।

চলতি মৌসুমে শেরপুর সদরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের চরমোচারিয়া, লছমনপুর, কামারের চর এবং নকলা উপজেলার চন্দ্রকোণা, চরঅষ্টধর, উরফা এবং পাঠাকাটাতে চীনা বাদামের চাষ বেশি হয়েছে। 

ইতিমধ্যে জমি থেকে বাদাম সংগ্রহ, বাছাই ও রোদে শুকানোর কাজ শুরু করেছে কৃষকরা। এই প্রক্রিয়ায় কর্মসংস্থান হয়েছে স্থানীয় অনেক নারী ও পুরুষের।

কৃষকরা জানান, বিঘা প্রতি দেশি চীনা বাদাম চাষে খরচ হয় তিন থেকে চার হাজার টাকা। যার বিপরীতে বিঘা প্রতি মুনাফা হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। লাভ বেশি হওয়ায় তাই দিন দিন বাড়ছে বাদামের আবাদ।

সরেজমিনে নকলা উপজেলার চরঅষ্টাধর গ্রামের কৃষক মো. আজগর আলীর (৫০) সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দেশি চীনা বাদাম চাষে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। এছাড়া জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয় না। জমিতে বাদাম চাষ শেষে সেখানে ধান বা ভুট্টার চাষ করে বাড়তি আয় করা যায়। বিশেষ করে চরাঞ্চলের উচু ও অনাবাদি জমি বাদাম চাষের জন্য উপযোগী। ফলে এক জমিতে তিন ফসল করা সম্ভব।

শেরপুর সদরের লছমনপুর ইউনিয়নের ছোট ঝাউয়ের চরের মালেক মিয়া (৪৮) বলেন, এক বিঘা জমিতে বাদাম চাষে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। খরচ বাদে বিঘা প্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা মুনাফা থাকে। এছাড়া শেরপুরের উৎপাদিত বাদামের মান উন্নত হওয়ায় দেশব্যাপী এর ব্যাপক চাহিদা আছে। 

তিনি বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে বাদাম কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ভরা মৌসুমে প্রতি মণ বাদাম ৩ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে বেচাকেনা হয়।

বাদামের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও চাষের পরিধি বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে স্থানীয় কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছে জেলা কৃষি বিভাগ।

দেশে বাদাম চাষ দিন দিন লাভজনক হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন পাইকার ও কৃষিপণ্য ব্যবসায়ীরা। 

তাদের মতে, বাদাম একটি বহুমুখী ফসল—খাদ্য, তেল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পে যার চাহিদা সারা বছরই স্থিতিশীল।

বাদামের পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন (৪৫) বলেন, বাদাম সংরক্ষণযোগ্য ফসল হওয়ায় ভালো দামে বিক্রির সুযোগ পান কৃষকরা। বিশেষ করে উন্নত জাত ও সঠিক শুকানোর ব্যবস্থা থাকলে বাজারে বাদামের মূল্য আরও বাড়বে। কারণ দেশে উৎপাদিত বাদামের মান আগের তুলনায় উন্নত হলেও এখনো প্রক্রিয়াজাতকরণ ও গ্রেডিংয়ের অভাব রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হচ্ছে।

বাদাম ব্যবসায়ী জয়নাল মিয়া (৪০) বলেন, বর্তমান সময়ে খুচরা পর্যায়ে বাদামের কেজি প্রতি মূল্য ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। কৃষক যদি সরাসরি পাইকারি বাজার বা সমবায়ের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করতে পারেন, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমবে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে। 

তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে উন্নত বীজ সরবরাহ, আধুনিক পদ্ধতিতে শুকানো ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি এবং সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া হলে বাদাম চাষ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পাইকার ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত মত হলো—সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাদাম চাষ কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানি সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।

জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, অন্যান্য ফসল থেকে বাদাম চাষে দ্বিগুণ লাভ হয়। এছাড়া বাদামের গাছ গৃহপালিত পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন বাসসকে বলেন, যে মাটিতে অন্য কোনো ফলন হয়না, সেখানে বাদাম চাষ লাভজনক। ফলে চরাঞ্চলের পতিত জমি বাদাম চাষের আওতায় আনা হয়েছে। বাদামের দাম এবং গুণমান ভাল হওয়ায় শেরপুরে দিন দিন এটির উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষক লাভবান হচ্ছে। 

কৃষি বিভাগ থেকে প্রতিনিয়ত বাদাম চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করে হচ্ছে বলে জানান তিনি।