শিরোনাম

ঢাকা, ১২ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : অনুমোদনহীন পথে চলাচলের অভিযোগে একটি জাহাজে গুলি চালানোর পর, রোববার ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালিয়েছে।
কৌশলগত এই নৌপথ বন্ধের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের চূড়ান্ত সমঝোতার পথে নতুন করে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল তারা নিয়ন্ত্রণ করবে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন বলছে, বিশ্বে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে পথ দিয়ে যায়, সেখানে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (রেভল্যুশনারি গার্ডস) জানিয়েছে, অনুমোদিত নৌপথ ব্যবহার করতে বারবার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তা অমান্য করায়, একটি জাহাজে হামলা চালিয়ে সেটিকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই ঘটনার পর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এবং এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে। কোনো জাহাজকে এই পথ দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।’
ইরান জাহাজটিতে গুলিকে ‘সতর্কতামূলক গুলি’ বলে উল্লেখ করলেও মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তেহরান হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজে ‘স্পষ্টভাবে হামলা’ চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ওই হামলায় জাহাজের একজন নাবিক নিখোঁজ হয়েছেন। আগুন ও ইঞ্জিন কক্ষের ক্ষতির কারণে জাহাজটি অচল হয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে সেন্টকম বলেছে, ‘এর জবাবে হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী বেসামরিক নাবিক ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা আরও দুর্বল করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে বড় মূল্য দিচ্ছে।’
সেন্টকম জানায়, ওয়াশিংটন সময় শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে হামলা শুরু করে। এটি চলতি সপ্তাহে তৃতীয় দফা হামলা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদেরকে তার মূল্য দিতে হবে।’
যুদ্ধ চলাকালে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালী বন্ধ করে দেয়।
এই প্রণালীটি জ্বালানি সমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান পথ। এই পথ বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরান বলছে, তারা জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে এবং এ জন্য ফি নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তাদের দাবি, যুদ্ধের আগের মতো অবাধ নৌচলাচলের যুগে আর ফেরা হবে না।
তবে ওয়াশিংটন ইরানের এ অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য ব্যবহৃত প্রণালীতে সাধারণত কোনো রাষ্ট্র টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না।
সর্বশেষ মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তার বাবা ও পূর্বসূরিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হাতে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্প নিজের বিরুদ্ধে কোনো হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দেন।
ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি শেষ বলে ঘোষণা দিলেও, আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন।
এদিকে কূটনৈতিক সমাধান টিকিয়ে রাখতে মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, শুক্রবার কাতারের একটি প্রতিনিধিদল ইরান সফর করেছে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক লিখিত বার্তায় বলেন, ‘প্রতিশোধ আমাদের জাতির ইচ্ছা। এটি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।’
তিনি বলেন, ‘এটি আমার ব্যক্তিগত উপস্থিতি বা অন্য কোনো কর্মকর্তার উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। আমরা থাকি বা না থাকি, এটি ঘটবেই।’
তিনি আরও বলেন, ইরান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে থেকে মোজতবা খামেনিকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
তার বাবা নিহত হওয়া হামলায় তিনিও আহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, তাকে হত্যার চেষ্টা করা হলে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেবে।
তিনি লেখেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের দিকে তাক করে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আরও হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তাৎক্ষণিকভাবে নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকবে, যদি ইরান সরকার বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উচ্চারিত হুমকি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বা আমাকে হত্যা বা হত্যার চেষ্টা করে।’
এমন পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেও মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।
ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থা শুক্রবার জানায়, ‘মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারের ভূমিকা আরও জোরদার করার চেষ্টা’ করতে দেশটির একটি প্রতিনিধিদল ইরান সফর করছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, গত মাসে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের অধীনে নিজেদের প্রতিশ্রুতি তেহরান পালন করেছে।
তবে তিনি যোগ করেন, ‘সম্মতি তখনই কার্যকর হবে, যখন উভয় পক্ষই তা মেনে চলবে।’