শিরোনাম

ঢাকা, ১২ জুলাই, ২০২৬ (বাসস): অবৈধ তামাক বাণিজ্য নির্মূল, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং সরকারি রাজস্ব সুরক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর একটি সমন্বিত ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের (এফওয়াই-২৭) জাতীয় বাজেটে প্রস্তাবিত এ ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল যাচাইকরণ, রিয়েল-টাইম নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততার সমন্বয়ের মাধ্যমে তামাকখাতে কর ফাঁকি রোধের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, তামাকের ওপর কর আরোপ জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং রাজস্ব আহরণের অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার।
তিনি বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণে তামাক কর অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো আধুনিক, ন্যায্য, বিনিয়োগবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর ভ্যাট ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করবে, ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, দেশীয় শিল্পকে সহায়তা করবে এবং টেকসই রাজস্ব আহরণে ভূমিকা রাখবে।’
এ উদ্যোগের মূল ভিত্তি হচ্ছে সমন্বিত 'ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস' ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে তামাকপণ্যের অবৈধ বাণিজ্য প্রতিরোধ এবং উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সঠিকভাবে কর আদায় নিশ্চিত করা হবে।
এ লক্ষ্যে তামাক উৎপাদনকারী কারখানায় এআই-সক্ষম ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় গণনাযন্ত্র স্থাপন করে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর রিয়েল-টাইম নজরদারি চালানো হবে।
এছাড়া, সিগারেটের কর স্ট্যাম্পে কিউআর কোড বা এআর কোড সংযুক্ত করা হবে, যাতে উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পণ্যের সত্যতা সহজেই যাচাই করা যায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তামাকজাত পণ্যের অবৈধ বাণিজ্য প্রতিরোধ এবং রাজস্ব সুরক্ষা জোরদারে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার রিয়েল-টাইম নজরদারি, উৎপাদন কারখানায় এআই-সক্ষম ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় গণনাযন্ত্র স্থাপন এবং সিগারেটের কর স্ট্যাম্পে কিউআর বা এআর কোড সংযোজনসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালু করা হবে।’
অবৈধ তামাকজাত পণ্যের বিরুদ্ধে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ চালুরও প্রস্তাব করা হয়েছে। এ অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা অবৈধ তামাকপণ্যের তথ্য সরাসরি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) জানাতে পারবেন।
এছাড়া, তামাকপণ্য চোরাচালান ও অবৈধ উৎপাদন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিলে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাও চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অননুমোদিতভাবে সিগারেট উৎপাদন ঠেকাতে সিগারেট ও বিড়ি তৈরির কাগজ আমদানি ও বিক্রির অনুমতি শুধু অনুমোদিত উৎপাদনকারীদের মধ্যে সীমিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে তামাকপণ্যের কাঁচামাল এবং নতুন ধরনের নিকোটিনজাত পণ্যের ওপরও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সঙ্গে তামাক সেবনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় সিগারেটের ফিল্টার তৈরিতে ব্যবহৃত অ্যাসিটেট টো ও ফিল্টার রডের ওপর ৩০০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া, নিকোটিন গ্র্যানিউলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানির ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে এসব পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা যায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তামাক সেবনের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় অ্যাসিটেট টো ও ফিল্টার রডের ওপর ৩০০ শতাংশ এবং নিকোটিন গ্র্যানিউলস ও নিকোটিন পাউচের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করছি।’
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্যও পুনর্নিধারণ করা হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের সিগারেটের মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া, প্রতি ১০ গ্রাম নিকোটিন পাউচের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা নির্ধারণের পাশাপাশি ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতি ১০ শলাকা হিটেড টোব্যাকো পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২১০ টাকা এবং এর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কঠোর নজরদারি, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজস্বনীতির সমন্বয়ে অবৈধ তামাক বাণিজ্য দমন, সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
সম্প্রতি ‘টোব্যাকো কন্ট্রোল’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি স্বাধীন প্যাক অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অবৈধ তামাকজাত পণ্যের বাজারের অংশ প্রায় ৫.৬ শতাংশ। তবে তামাক শিল্পখাতের হিসাবে এ হার ১৮ শতাংশেরও বেশি।
এছাড়া, ‘কমব্যাটিং ইলিসিট সিগারেট ট্রেড টু প্রটেক্ট পাবলিক রেভিনিউ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে অবৈধ সিগারেটের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
এছাড়া 'বাংলাদেশে সরকারি রাজস্ব সুরক্ষায় অবৈধ সিগারেট বাণিজ্য দমন' শীর্ষক সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশে অবৈধ তামাক বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ায় সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।