শিরোনাম

ঢাকা, ৪ আগস্ট ২০২৬ (বাসস) : বিশ্বকাপ শেষে একটি প্রশ্ন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাকর পুরস্কার ব্যালন ডি’অর কে জিতবে? বিশ্বকাপ শেষে এবারের এই পুরস্কারের দৌড়ে নি:সন্দেহে এগিয়ে আছেন হ্যারি কেন, রদ্রি, লামিন ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসি।
হ্যারি কেন :
ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৬৪ ম্যাচে ৭৩ গোল- লিওনেল মেসির ২০১১-১২ মৌসুমের ৮২ গোলের পর ইতিহাসের কোনো খেলোয়াড়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলসংখ্যা। একসময় চ্যাম্পিয়নশিপে জেমি ভার্ডির পাশে বেঞ্চে বসে থাকা একজন খেলোয়াড়ের জন্য সংখ্যাটা মোটেও খারাপ নয়। এই তালিকার অন্য কয়েকজনের মতো কিশোর বয়সে বিস্ময়বালক হিসেবে আবির্ভূত হননি হ্যারি কেন। অথচ ৩৩ বছর বয়সে এসে তিনি ফুটবলের শীর্ষ সারিতে জায়গা করে নিয়েছেন।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো গত ১২টি মৌসুমের প্রতিটিতে অন্তত ২৪ গোল করা, প্রিমিয়ার লিগে টানা দুটি গোল্ডেন বুট, বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট এবং দুটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জেতা একজন খেলোয়াড় ব্যালন ডি’অর ভোটে কখনোই ১০ম স্থানের ওপরে উঠতে পারেননি।
গোল করার পরিসংখ্যান সবসময়ই ছিল, এবার তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে ট্রফিও। গত বছর বায়ার্ন মিউনিখ বুন্দেসলিগা জেতার মাধ্যমে কেনের দীর্ঘ ট্রফিখরা শেষ হয়। এরপর যেন সাফল্যের দরজা খুলে গেছে। এই মৌসুমেও আরেকটি বুন্দেসলিগা শিরোপার সঙ্গে ডিএফবি-পোকাল ও জার্মান সুপারকাপ জিতেছেন তিনি।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড তাদের ট্রফিখরা কাটাতে পারেনি। তবে অধিনায়ক কেন ছয় গোল করেছেন এবং বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে গ্যারি লিনেকারকে ছাড়িয়ে গেছেন। ফলে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তিনি এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
লামিন ইয়ামাল :
“ব্যাপারটা শান্ত থাকার। বল যখন আমার কাছে বক্সের মধ্যে থাকে, তখন কী হবে সেটা আমিই ঠিক করি”, ফেব্রুয়ারিতে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে বার্সেলোনার ৪-১ গোলের জয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক করার পর বলেছিলেন লামিন ইয়ামাল। অধিকাংশ ১৯ বছর বয়সীর ক্ষেত্রে কথাটা ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু ইয়ামাল তো আর অধিকাংশ ১৯ বছর বয়সীর মতো নন।
এবারের গ্রীষ্মেও তার আরও প্রমাণ মিলেছে। স্পেনের এই ফরোয়ার্ড ২০ বছর বয়সে পা দেওয়ার আগেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল ও বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা প্রথম খেলোয়াড় হয়েছেন এবং দুটিই জিতেছেন।
বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল করেছেন তিনি, যা তার নিজের নামের পাশে সামান্য অবদান। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টেই ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া পেনাল্টি আদায় করেন, পুরো টুর্নামেন্টে মেসির চেয়ে বেশি সফল ড্রিবল করেন এবং ফাইনালে শারীরিক দ্বৈরথে তাকে জড়িয়ে ফেলার জন্য মরিয়া আর্জেন্টিনা রক্ষণ ভাঙতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আর এসব করেছেন হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে বিশ্বকাপে নামার পর।
ফাইনালের পর সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জো হার্টের মন্তব্যটাই যেন ইয়ামালের পারফরম্যান্সের সবচেয়ে ভালো সারাংশ : “লামিন ইয়ামালের বয়স ১৯। তার জন্য কী অসাধারণ একটি দিন। তার বয়স ১৯ এবং সে ফুটবল জয় করে ফেলেছে।”
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বার্সেলোনার হয়ে ৪৫ ম্যাচে তার ২৪ গোল ও ১৮ অ্যাসিস্ট। দলটি জিতেছে লা লিগা ও সুপারকোপা। সব মিলিয়ে গত বছরের ব্যালন ডি’অরে রানার্সআপ হওয়া ইয়ামাল এবার এক ধাপ এগিয়ে শিরোপা জয়ের শক্ত দাবীদার।
রদ্রি :
“বিশ্বকাপে আমরা আসল রদ্রিকে দেখতে পাব”- গত অক্টোবরে ম্যানচেস্টার সিটির অধিনায়ক রদ্রি এসিএল চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরার পর বলেছিলেন কোচ পেপ গার্দিওলা। ২০২৩ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই মিডফিল্ডার আর কখনো নিজের সেরা অবস্থায় ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু ফুটবলের অধিকাংশ বিষয়ের মতো এবারও গার্দিওলার কথাই সত্যি হয়েছে।
স্পেন দলের হৃদস্পন্দন ও নিরাপত্তার ছাতা ছিলেন রদ্রি। ম্যাচের প্রতিটি ধাপ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, বল দখল পরিচালনা করেছেন এবং রক্ষণভাগের দিকে আসা প্রায় প্রতিটি বিপদ নিভিয়ে দিয়েছেন। পুরো টুর্নামেন্টে আট ম্যাচে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে।
রদ্রি ৭৫৬টি পাস সম্পন্ন করেছেন, টুর্নামেন্টে সবার চেয়ে বেশি। টাচ, প্রতিপক্ষের রক্ষণভেদী পাস এবং প্রতিপক্ষের এক-তৃতীয়াংশে পাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও ছিলেন শীর্ষে। শুধু ফাইনালেই তিনি ১০১টি পাস সম্পন্ন করেন। আর্জেন্টিনার ওপর এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন যে তারা লক্ষ্যে একটি শটও নিতে পারেনি।
স্পেনের অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলেছেন রদ্রি, জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল। পাশাপাশি ফুটবলের সবচেয়ে অভিজাত ক্লাবগুলোর একটিতে জায়গা করে নিয়েছেন, ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, ইউরোপিয়ান কাপ ও ব্যালন ডি’অর জেতার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তার আগে এই কীর্তি ছিল গার্ড মুলার, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও জিনেদিন জিদানের।
কিলিয়ান এমবাপ্পে :
বিশ্বকাপে সাবেক প্যারিস সেইন্ট-জার্মেই সতীর্থ লিওনেল মেসির সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে নেমেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তারা ট্রফি, গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল এবং বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার ইতিহাস গড়ার জন্য লড়েছেন। চারটির মধ্যে দুটিতে জয় পেয়েছেন এমবাপ্পে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে দুই গোলের সুবাদে তিনি প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জেতেন। বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২২, মেসির চেয়ে একটি বেশি। ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের পর একই বিশ্বকাপ আসরে দুই অঙ্কের গোল করা প্রথম খেলোয়াড়ও হয়েছেন তিনি।
তবু এটি এমবাপ্পের কাঙ্খিত অর্জন ছিল না। ফ্রান্সের অধিনায়ক বলেছিলেন, “আমি শীর্ষ গোলদাতা না হয়ে ফাইনালে খেলতেই বেশি পছন্দ করতাম।”
ক্লাব পর্যায়েও তার মৌসুম ছিল গোলসমৃদ্ধ, কিন্তু হতাশাজনক। ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করেছেন, লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ, দুই প্রতিযোগিতাতেই মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। কিন্তু কোনো ট্রফিই জিততে পারেননি। গোল এসেছে, কিন্তু পদক আসেনি। কেন যেমন বুঝেছেন, শুধু গোল করাই ব্যালন ডি’অর জয়ের জন্য খুব কম ক্ষেত্রেই যথেষ্ট।
লিওনেল মেসি :
৮০ হাজার দর্শকের স্টেডিয়ামে একা মেঝেতে বসে ছিলেন লিওনেল মেসি। পায়ে জুতা নেই, দূরে তাকিয়ে আছেন। আর তার পাশ দিয়ে স্পেনের বদলি খেলোয়াড়েরা উদযাপন করতে করতে চলে যাচ্ছেন। বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আর্জেন্টিনার অধিনায়ক যে রূপকথার সমাপ্তি কল্পনা করেছিলেন, এটি তা ছিল না। আর আগের ছয় সপ্তাহের পারফরম্যান্স বিবেচনায়, তার দল ভালো করতে না পারলেও মেসির আরও ভালো কিছু প্রাপ্য ছিল বলে মনে হয়েছে।
অনেকে ভেবেছিলেন, ৪০তম জন্মদিনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সাবেক এই মহাতারকার শেষ বিশ্বকাপটা হয়তো শুধু নস্টালজিয়ার গল্প হবে। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে বসেন তিনি। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুটি গোল করেন, যোগ করেন জর্ডানের বিপক্ষে আরেকটি।
গ্রুপ পর্বেই টুর্নামেন্টে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন মেসি। এরপর নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনাকে প্রায় একাই টেনে নিয়ে যান, কেপ ভার্দের বিপক্ষে একটি গোল, মিসরের বিপক্ষে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি অ্যাসিস্ট এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে বিদায় করার পথে আরও দুটি অ্যাসিস্ট।
গোলবন্যার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে এমবাপ্পে জোড়া গোল না করলে গোল্ডেন বুটটিও মেসির হাতেই উঠত।
বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরে গিয়েও কি ব্যালন ডি’অর জিততে পারেন মেসি? গত ১৯ বছরে মাত্র চারবার এমন হয়েছে, যখন একই বছরে চ্যাম্পিয়নস লিগ, বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা কোপা আমেরিকা না জিতেও কোনো খেলোয়াড় ব্যালন ডি’অর পেয়েছেন। এর মধ্যে তিনবারই পুরস্কারটি জিতেছেন মেসি।
নবম ব্যালন ডি’অর জয় হয়তো কিছুটা হলেও কঠিন। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সে, এমএলএসে খেলে এবং বিশ্বকাপের ফাইনালে হেরেও তিনি যে এখনও এই আলোচনার অংশ, এটাই তার অসাধারণত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।