বাসস
  ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২২

বাংলার ভেনিস বরিশালে নজরুলের স্মৃতিময় পদচারণা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ফাইল ছবি

॥ সেলিনা শিউলী ও এম মোফাজ্জেল হোসাইন ॥

ঢাকা, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ভাগ্নে ওয়াজির আলী ও ইউসুফ আলীর আমন্ত্রণে ১৯২০ সালের অক্টোবরে (দুর্গাপূজার সময়) বরিশাল গিয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

এ সময় ফজলুল হক বরিশালে অবস্থান করছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম বরিশালে ছিলেন দু’দিন। এ দু’দিনে বরিশালের যে বিশেষ দু’টি বৈশিষ্ট্য তাঁর মনকে নাড়া দিয়েছিল এর একটি হলো বরিশালের প্রকৃতি, যা ইতালীর ভেনিস শহরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অন্যটি হল, বরিশালে খ্রীস্টান মিশনারীদের তৎপরতার কেন্দ্র।

শের-ই-বাংলা এ. কে ফজলুল হকের ‘নবযুগ’ পত্রিকায় লেখনীর মধ্য দিয়েই নজরুলের সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। নবযুগ পত্রিকা ছাড়াও সিলেট সফর, কলকাতায় জাতীয় সংবর্ধনা, অসুস্থ নজরুলের চিকিৎসায় শের-ই-বাংলা সবসময় ছিলেন নজরুলের পাশে।

বরিশালের নজরুল গবেষক বেগম ফয়জুন নাহার শেলী বাসসের সাথে আলাপকালে বলেন, ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে শের-ই-বাংলা এ. কে ফজলুল হকের ছিল অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক। নজরুল সাহিত্য, জীবন ও প্রতিভা লালনে শের-ই-বাংলার অবদান অনস্বীকার্য। গণমুখীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা, স্বাধীন অবিভক্ত বাংলার প্রবক্তা হিসেবে এ দু’জনের মধ্যে ছিল মনমানসিকতার সাদৃশ্য ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা।’

শেলী বলেন, ‘বৃহত্তর বরিশালে জন্মগ্রহণকারী কবি ও ‘জাতীয় মঙ্গল’ কাব্যের প্রণেতা কবি মোজাম্মেল হক ছিলেন ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। এ সমিতি থেকে ত্রি-মাসিক ‘বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা’ প্রকাশিত হতো। এ পত্রিকায় ‘কোরক’ শিরোনামে নতুন কবিদের কবিতা প্রকাশ পেতো। এখানেই ১৩২৬ এর শ্রাবণ সংখ্যায় (১৯১৯-জুলাই-আগস্ট) কবি নজরুলের প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয়। প্রথমে কবিতাটির শিরোনাম ছিল ‘ক্ষমা’। কবি মোজাম্মেল হকের পরামর্শে পরে কবিতার নামকরণ হয় ‘মুক্তি’। এছাড়া কবি মোজাম্মেল হকের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘ওরিয়েন্টাল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স লিমিটেড’ হতে নজরুলের ‘পুবের হাওয়া’ গ্রন্থটি প্রকাশ পায়।’

বরিশালের নজরুল বিষয়ক লেখক ও সাংবাদিক আযাদ আলাউদ্দিনের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের কাছে কবিকে তুলে ধরতে হলে তাঁকে নিয়ে চর্চা বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার নজরুল-বর্ষ ঘোষণা করেছে। একে ঘিরে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। পরিতাপের বিষয়, বরিশালে নজরুলের নামে কোন স্থাপনা বা স্মৃতিচিহ্ন নেই। তাঁর নানা সৃষ্টি ও রচনার নিদর্শন বরিশালে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা চাই স্কুল, কলেজ, পাঠাগারে যাতে নজরুলের বই পাওয়া যায়। নজরুলের কর্ম সবত্র ছড়িয়ে দেয়া হলে নজরুল-বর্ষ পূর্ণতা পাবে।

তিনি বরিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি করেন। একই সাথে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নজরুল রচনাবলী সংরক্ষণ ও নজরুল বিষয়ক নিয়মিত পাঠচক্র করারও প্রস্তাব দেন।

বরিশাল সফর নজরুলের সষ্টিশীলতায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। শহরের খাল-নদীঘেরা প্রকৃতি তাঁকে মুগ্ধ করছিল।
কবির দ্বিতীয় উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ বরিশালের স্মৃতি নিয়ে রচিত। এটি ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ তথা ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে  গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর আগে মাসিক ‘সওগাত’ পত্রিকায় ১৩৩৪ এর অগ্রহায়ণ সংখ্যা থেকে ১৩৩৬ এর ফাল্গুন সংখ্যা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল।

কবি ১৯২৬ সালের ২ জানুয়ারি হুগলী ছেড়ে কৃষ্ণনগরে যান। সেখানে তিনি শ্রমজীবী খ্রীস্টান ও মুসলমান অধ্যুষিত চাঁদ-সড়ক এলাকায় একজন খ্রীস্টান নারীর বাড়িতে ওঠেন । হতদরিদ্র এই পরিবারগুলোর ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনের করুণ কাহিনীকে বাস্তব অভিজ্ঞতার রসে সিঞ্চিত করে কবি রচনা করেন ’মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসটি। এ উপন্যাসে বরিশাল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ক্ষুধার সর্বগ্রাসী প্রভাব কীভাবে মানুষকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, এমন কি তার আজন্ম লালিত ধর্ম বিশ্বাস ও মন মানসিকতাকে পর্যন্ত বিপর্যস্ত করে ফেলে তারই বাস্তবচিত্র তিনি এঁকেছেন ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে।

বরিশালে অবস্থানকালে নজরুল চারটি গান রচনা করেন বলে তাঁর রচনাকাল সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা যায়। গানগুলো হলো ‘দূরের বন্ধু’, ‘আশা’, ‘মরমী’ এবং ‘পথের স্মৃতি’। এসব গানের রচনাস্থল হিসেবে ‘বরিশাল, আশ্বিন ১৩২৭’ উল্লেখ রয়েছে।

‘দূরের বন্ধু’ গানের পঙক্তি
“বন্ধু আমার! থেকে থেকে
কোন্ সুদূরের বিজন-পূরে
ডাক দিয়ে যাও ব্যথার সুরে”
বরিশাল-সফরের স্মৃতির সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত।

‘আশা’ গানের শুরু
“হয়তো তোমার পাব দেখা
যেখানে ঐ নত আকাশ চুমছে বনের সবুজ রেখা।”

অন্যদিকে ‘মরমী’ গানের পঙক্তি
“কোন্ মরমীর মরম-ব্যথা
আমার বুকে বেদনা হানে”
এবং ‘পথের স্মৃতি’ গানের শুরু
“পথিক ওগো চলতে পথে
তোমায় আমায় পথের দেখা”
বরিশালে রচিত নজরুলের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির অংশ।

কবি নজরুল হুগলিতে রচিত 'অশ্বিনীকুমার' কবিতায় বরিশালকে 'বীরভূমি' এবং কৃষ্ণনগরে রচিত ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে বরিশালকে 'বাংলার ভেনিস' বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে নজরুল ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচনে ঢাকা বিভাগ (ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ) থেকে স্বরাজ পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ সময়ও তিনি নির্বাচনী প্রচারে বরিশাল সফর করেন।