বাসস
  ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:১১
আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:২৫

স্কুল ফিডিং, বাড়ছে খুদে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও মনোযোগ

চট্টগ্রামের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা খাবার হাতে পেয়েই মেতে উঠছে আনন্দে। ছবি: বাসস

॥ মোহাম্মদ আবু বক্কর ॥

চট্টগ্রাম, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাড়ে ১০টা। আনোয়ারা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক (২)-এর শ্রেণিকক্ষ। খুদে শিক্ষার্থীরা শান্ত হয়ে বসে আছে। এখন তাদের টিফিন ছুটি। টিফিনের অপেক্ষায় মায়াভরা মুখগুলোতে ফুটে উঠেছে উচ্ছ্বাসের ছাপ। ঘণ্টা বাজতেই টিফিন নিয়ে হাজির বিদ্যালয়ের সহকারী সোহরাব হোসেন। একে একে প্রত্যেকের হাতে তুলে দিলেন দু’টি করে বনরুটি ও একটি করে সেদ্ধ ডিম। সবার জন্য একই খাবার। খাবার হাতে পেয়েই কেউ মেতে উঠল আনন্দে। কেউ আবার পরম তৃপ্তিতে খাওয়া শুরু করল।

টিফিনের পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো বনরুটির খালি প্যাকেট ও ডিমের খোসা নিয়ে ছোটাছুটি। তবে এই ছোটাছুটি শ্রেণিকক্ষ নোংরা করতে নয়। বরং শ্রেণিকক্ষে রাখা ময়লার বিনে ব্যবহৃত প্যাকেট ও ডিমের খোসাগুলো সুশৃঙ্খলভাবে ফেলার জন্য। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একই নিয়মে স্কুলে খাবার পাচ্ছে তারা। সপ্তাহে পাঁচ দিনের খাদ্য তালিকায় তিন দিন দেওয়া হচ্ছে বনরুটি ও ডিম, এক দিন বনরুটি ও ইউএইচটি দুধ এবং আরেক দিন ফর্টিফাইড বিস্কুট ও কলা। এই বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৩৬৭ জন শিক্ষার্থীই এখন নিয়মিত স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।

শুরুতেই কথা হয় প্রাক-প্রাথমিক (২)-এর শিক্ষার্থী রুমাইসা চৌধুরী ঈসালের সঙ্গে। টিফিনের খাবার কেমন লাগে— জানতে চাইতেই মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে জানায়, তার বেশ ভালো লাগে। তবে খাবারের মধ্যে দুধ, বিস্কুট ও কলা তার সবচেয়ে পছন্দ। টিফিনের সময়টা তার কাছে বেশ আনন্দের। ছোট্ট ঈসাল বলে, ‘বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার খেতে আমার খুব ভালো লাগে।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশের আট বিভাগের ১৫০টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে চলছে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম। চট্টগ্রাম বিভাগের ১৩টি উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী স্কুল ফিডিং বা মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আওতায় দেশের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন স্কুল চলাকালীন পুষ্টিকর খাবার সরবরাহের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো, ঝরে পড়া রোধ এবং পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানোই এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।

২০২৬ সালের ২৯ মার্চ থেকে চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে শুধু আনোয়ারা উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। উপজেলার ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী এখন নিয়মিত স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে।

কর্মসূচির শুরুতে স্বদেশপল্লী নামে একটি বেসরকারি সরবরাহকারী সংস্থা বনরুটি, কলা ও সেদ্ধ ডিম সরবরাহের মাধ্যমে এ উপজেলায় কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে স্বদেশপল্লীর পাশাপাশি প্যারাগণ ইউএইচটি দুধ এবং প্রাণ কোম্পানি ফর্টিফাইড বিস্কুট সরবরাহ করছে। পুরো কার্যক্রম তদারকির জন্য পাঁচ সদস্যের একটি ‘মাদার্স কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে তিনজন মা, একজন অভিভাবক সদস্য (বাবা) এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রয়েছেন। কমিটির সদস্যরা প্রতিদিন সরবরাহকারীর কাছ থেকে খাবার বুঝে নেওয়ার সময় এর মান ও পরিমাণ পরীক্ষা করেন। খাবারে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়লে তা সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন করে নেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হিন্দোল বারী জানান, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পর বিদ্যালয়গুলোতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। আগে কর্মজীবী মায়েদের ব্যস্ততা ও অনেক পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক শিশু খালি পেটে স্কুলে আসতো। এতে ক্লাসে তাদের মনোযোগ কম থাকত। এখন স্কুলেই খাবার পাওয়ায় শিশুরা ক্লাসে বেশি মনোযোগী ও উৎফুল্ল থাকছে।

তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী টিফিনের সময় বিদ্যালয় থেকে চলে যেত। স্কুল ফিডিং চালুর পর এ প্রবণতা অনেকটাই কমেছে। এখন তারা সারিবদ্ধভাবে খাবার গ্রহণ করছে এবং খাওয়ার পর প্যাকেট, কলার খোসাসহ উচ্ছিষ্ট নির্ধারিত ময়লার বিনে ফেলছে। এতে তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে উঠছে। সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, সবাই একই ধরনের খাবার পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতার বোধ তৈরি হচ্ছে। এছাড়া এই কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে অভিভাবকদের আগ্রহও বাড়ছে।

প্রধান শিক্ষিকা রোমেনা আক্তার খানম বলেন, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালুর পর শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বেড়ে গেছে। আগে বিদ্যালয়ে গড়ে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও এখন তা বেড়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন পাশের বীরপুর এলাকার বাসিন্দা মায়েশা বিনতে অয়ন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় স্কুলে থাকে, তাদের জন্য এই কর্মসূচি বেশ উপকারী। বাচ্চারা তো সবসময় বাড়ি থেকে খেয়ে স্কুলে আসে না। আগে এ নিয়ে অনেক চিন্তায় থাকতে হতো। কিন্তু এখন আমরা কিছুটা নিশ্চিন্ত। কারণ, বাচ্চা স্কুলে অভুক্ত থাকবে না।

কথা হয় আনোয়ারা সদরের বাসিন্দা ও মাদার্স কমিটির সদস্য আরজু আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, শুরুতে খাবারের মান নিয়ে কিছুটা সমস্যা হতো। বিশেষ করে কলার মান নিয়ে অভিযোগ ছিল। তবে, এখন সেই সমস্যা অনেকটাই কেটে গেছে। সরবরাহকারী প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে খাবার সরবরাহ করেন। আমরা প্রথমে খাবারের মান যাচাই করি। এরপর তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। কোনো খাবারের মান নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে তা সরবরাহকারীকে জানিয়ে পরিবর্তন করে নেওয়া হয়।

আশ্চর্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা দীপক দাশ সন্তানের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন বিদ্যালয়ের গেটের বাইরে। প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, আমাদের একটাই চাওয়া— খাবারের মানটা যেন সবসময় ভালো থাকে। শিশুরা যেন খাবার খেয়ে অসুস্থ না হয়। এ খাবার যেন তাদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। সপ্তাহে চার দিন শিশুদের টিফিনে বনরুটি দেওয়া হচ্ছে। বনরুটির পরিবর্তে অন্য কোনো খাবার দেওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা উচিত। কারণ, অনেক সময় শিশুরা একই ধরনের খাবার বারবার খেতে চায় না।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মদ বলেন, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আমরা একটি “হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ” করেছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ইউপিইও), সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এইউপিইও), প্রধান শিক্ষক ও খাবার সরবরাহকারীরা গ্রুপে যুক্ত আছেন। এই গ্রুপের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি, এই কর্মসূচির সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটির সম্পৃক্ততাও ক্রমেই বাড়ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে পাইলট আকারে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চলছে। পাইলট কর্মসূচির অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে আগামী জানুয়ারি থেকে দেশব্যাপী এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি বলেন, শিশুদের বয়সভিত্তিক দৈনিক ও সাপ্তাহিক পুষ্টির চাহিদা বিবেচনা করে গবেষণার মাধ্যমে খাদ্যতালিকা তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা ও ভারতের তামিলনাড়ুর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে মায়েদের সম্পৃক্ততায় রান্না করা খাবার সরবরাহের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে শাকসবজি, ডিম, মাছসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে মায়েদের মাধ্যমে রান্না ও সরবরাহের সম্ভাব্য মডেল পরীক্ষার জন্য শিগগিরই একটি পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে।

শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও মনোযোগ বাড়ানো, ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষার পরিবেশে শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এগিয়ে চলছে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি। আনোয়ারা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে এই কর্মসূচি ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। দেশব্যাপী এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়া রোধে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।