শিরোনাম

॥ আবু মোশাররফ ॥
চট্টগ্রাম, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : দেশের সর্বদক্ষিণের উপজেলা টেকনাফের সুপারির খ্যাতি দেশজোড়া। তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে সেই সুপারি নিয়ে গাওয়া আঞ্চলিক গান। গত এক দশক ধরে এখানকার সুপারি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। তবে, সুপারির এই অর্থনৈতিক মূল্যের কাছে প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকেছে ‘গাছের অপূর্ব শোভা’।
টেকনাফে পথে, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের কোথাও একপাশে, কোথাও দুইপাশে; আবার কোথাও পাহাড়ের ঢালজুড়ে গড়ে উঠেছে সুপারি বাগানের নিবিড় সবুজ। পর্যটন শহরের ইনানী সৈকত, হিমছড়ি কিংবা উখিয়ার পাতোয়ারটেক— আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলোয় রূপের পালক হয়ে আছে এই সুপারি বাগান। সৈকতে ঝাউবিথি আর ঘন বন জঙ্গলের গাছগাছালি— উচ্চতায় সবাইকে ছাড়িয়ে সুপারি গাছ উঁকি মারে আকাশে। কবিগুরুর ‘তালগাছ’ কবিতার অনুরণনই যেন টেকনাফের পথে পথে ছড়িয়েছে তারা। ‘এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হয়ে সুপারি গাছগুলো তাদের অবসরযাপনের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
সরেজমিনে দেখা যায়, হিমছড়ির পাহাড়ি ঢালে সবুজের কতই না আয়োজন! তারই মাঝে অন্যরকম এক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি সুপারি গাছ। যেন চারপাশের সবুজকে ছাপিয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলেছে তারা— সরু কাণ্ডে দীর্ঘ দেহ, মাথার উপরে পাতার মুকুট। ভাদ্রের মাঝামাঝি এখন গাছে গাছে ঝুলছে সুপারি ফল। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, মাটির বুক চিরে এক সঙ্গে অনেকগুলো সবুজরেখা উঠে গেছে আকাশ ছোঁয়ার প্রত্যাশায়। অনাবিল এই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা। তাই পথ চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যায় পর্যটকের গাড়ি। ক্যামেরা উঠে আসে হাতে। কেউ দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, কেউ আবার গাছের সারির দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। কলতলী মোড় থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সুপারি বাগান যোগ করেছে নতুন মাত্রা; যেখানে কৃষি, প্রকৃতি আর পর্যটনের সৌন্দর্য মিলেমিশে রচিত হয়েছে অনন্য দৃশ্যপট।

হিমছড়ির দক্ষিণ মাংলাপাড়া এলাকায় কথা হয় ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা আবু হেনা শাকিলের সাথে। তিনি বাসস-কে বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভে সমুদ্র আর পাহাড় দেখব, সেটাই জানতাম। কিন্তু রাস্তার পাশে এতো সুন্দর সুপারি বাগান আছে, সেটা আগে জানতাম না। বাগানের সামনে গাড়ি থামিয়ে ছবি না তুলে থাকা যায় না।’
চট্টগ্রাম থেকে আসা আরেক পর্যটকের ভাষায়, ‘সুপারি গাছগুলো অনেক উঁচুতে মাথা তুলে সারিবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজের মধ্যে কোনো প্রাকৃতিক স্থাপনা তৈরি হয়েছে। সমুদ্র আর পাহাড়ের সঙ্গে এই গাছগুলো দৃশ্যটাকে আরো সুন্দর করেছে।’
দেখা গেল, এখন অনেক বাগানে সুপারি গাছে ফলন এসেছে। গাছের মাথায় থোকায় থোকায় ঝুলছে কাঁচা সুপারি। দূর থেকে এসব ফলের থোকা খুব বেশি স্পষ্ট না হলেও বাগানের ভেতরে ঢুকলে গাছের ডালে ডালে ফল চোখে পড়ে। স্থানীয়দের কাছে এসব সুপারি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। টেকনাফসহ কক্সবাজার অঞ্চলের সুপারির চাহিদা দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। ফলে, বাগানগুলো থেকে উৎপাদিত সুপারি স্থানীয় বাজার পেরিয়ে দেশের নানা অঞ্চলে যায়।
দক্ষিণ মাংলাপাড়া এলাকার সুপারি বাগান মালিক মনজুর আলম বলেন, ‘সুপারি আমাদের এলাকার পুরোনো চাষ। এর চাহিদা ভালো থাকায় বাগান করে লাভ পাওয়া যায়। গাছ বড় হতে একটু সময় লাগে এটা ঠিক। কিন্তু, একবার ফলন শুরু হলে অনেক বছর সুপারি বিক্রি করে আয় করা যায়।’
তিনি আরো জানান, সুপারি বিক্রি হয় ‘পন’ হিসেবে। ৮০টি সুপারিতে এক পন হয়। বাগানে এক পন সুপারির দাম আকার ও জাতভেদে ২২০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত।
মেরিন ড্রাইভে এখন শুধু সাগরের ঢেউ কিংবা পাহাড়ের ছবি নয়, সুপারি বাগানও পর্যটকদের ক্যামেরায় জায়গা করে নিচ্ছে। রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ কোনো বাগান চোখে পড়লে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলছেন অনেকেই। বিশেষ করে ভাদ্রের বৃষ্টিতে গাছের পাতাগুলো ধুয়ে যাওয়ার পর সবুজের দৃঢ়তা বেড়ে গেছে। ভেজা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আকাশছোঁয়া সুপারি গাছের ছবি তুলছেন পর্যটকরা। অনেকেই গাছের সারির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করছেন।
কুমিল্লা থেকে আসা তরুণ পর্যটক মীর সাব্বির হোসেন বলেন, ‘আমরা আসলে ইনানী যাওয়ার জন্য গাড়িতে ছিলাম। রাস্তার পাশে সুপারি বাগান দেখে গাড়ি থামিয়েছি। গাছগুলো এতো লম্বা আর এক সঙ্গে এতো সুন্দরভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে ছবি না তোলার ইচ্ছে হলো।’ তিনি বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে ভালো লাগে যে, দৃশ্য বারবার বদলে যায়। এক জায়গায় সমুদ্র, একটু পর পাহাড়, আবার কোথাও সুপারি বাগান। পুরো পথটাই যেন আলাদা আলাদা ছবির ফ্রেম।’
প্রসঙ্গত, সুপারি বাগানকে কেন্দ্র করে শুধু বাগান মালিকই নন, স্থানীয় বহু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হন। গাছের পরিচর্যা, সুপারি সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা। বাগান থেকে সংগ্রহের পর সুপারি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাতে যায়। পরে তা বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। ফলে, একটি সুপারি গাছের ফলন ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে একাধিক স্তরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হয়।
উখিয়ার প্যাঁচারদ্বীপ এলাকার ইউপি সদস্য সাহাবউদ্দিন বলেন, ‘সুপারি এ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের পরিচিত ফসল। অনেক পরিবার বাগান থেকে আয় করে। এখন এর সঙ্গে পর্যটনের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। পর্যটকরা বাগান দেখে আগ্রহী হচ্ছেন, ছবি তুলছেন। ফলে, এলাকার সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষির প্রতিও মানুষের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘তবে পর্যটক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাগান ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটকরা যেন বাগানে ঢুকে গাছ বা ফলের ক্ষতি না করেন, ময়লা না ফেলেন— এ বিষয়ে সচেতনতা দরকার।’
স্থানীয় সাংবাদিক রাসেল চৌধুরী বাসস-কে বলেন, পরিকল্পিতভাবে কিছু সুপারি বাগানকে পর্যটনবান্ধব করা গেলে এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। বাগানের ভেতর হাঁটার জায়গা, বসার ব্যবস্থা কিংবা স্থানীয় ফল ও কৃষিপণ্য বিক্রির সুযোগ থাকলে পর্যটকরা আরো কিছু সময় সেখানে কাটাতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘অনেক পর্যটক গাড়ি থামিয়ে বাগানের সামনে ছবি তোলেন। কেউ কেউ জানতে চান সুপারি কীভাবে চাষ হয়। যদি ভালোভাবে ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে পর্যটকরা কৃষি সম্পর্কেও জানতে পারবেন।
মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো— এখানে প্রকৃতি ও মানুষের জীবন পাশাপাশি চলে। একদিকে সাগর, অন্যদিকে পাহাড়; তার মাঝখানে রাস্তা, আর সেই রাস্তার পাশে স্থানীয় মানুষের বসতি ও কৃষিজমি। সুপারি বাগান সেই বাস্তবতারই একটি অংশ।