বাসস
  ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৫
আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৩৮

দুর্গম পাহাড়ে ‘বাড়ির কাছেই’ সুপেয় পানি, পরিবর্তনের রূপকার প্রতিমন্ত্রী হেলাল

বান্দরবানের দুর্গম এলাকার সরকারি উদ্যোগে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছবি: বাসস

॥ আবু মোশাররফ ॥

চট্টগ্রাম, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : এক সময় পাহাড়ি ছড়া, ঝিরি-ঝর্ণার ঘোলা-কাদা পানিই ছিল বান্দরবানের দুর্গম এলাকার মানুষের প্রধান ভরসা। সেই পানি সংগ্রহেও স্থানীয় নারী-শিশুদের দিনের একটি বড় সময় ব্যয় করতে হতো। পানির জন্য হাহাকার আর সংগ্রহের সেই ‘যুদ্ধ’ আর নেই। জেলার দুর্গম এলাকার অর্ধশত পাড়ায় এখন ‘বাড়ির কাছেই’ মিলছে সুপেয় পানি। সরকারি উদ্যোগে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় সেখানে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
 
দুর্গম পাহাড়ের মানুষের অনেক বছরের এই ‘বড় কষ্ট’ দূর করার প্রধান কারিগর ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্গম এলাকার মানুষদের কাছে সুপেয় পানি পৌঁছাতে দ্রুত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিবিড় মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসেন। নিজ তত্ত্বাবধানে নতুন প্রযুক্তির সহায়তায় একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত পানি সংকট নিরসন করেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বাসস-কে বলেন, ‘পাহাড় থেকে সমতল— সর্বত্রই এই দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটানো এই সরকারের প্রধানতম লক্ষ্য। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের প্রতিদিনের দুর্ভোগ-দুর্দশা কীভাবে লাঘব করা যায়, কীভাবে মানুষের জীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া, সুখ-সমৃদ্ধি বাড়ানো যায়— তা নিয়েই কাজ করছে এই সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা মন্ত্রিপরিষদ সদস্যসহ সরকারের পুরো প্রশাসন রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছি সে লক্ষ্য অর্জনে। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়া তারই অংশ। এসব প্রকল্পের আওতায় বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা পাহাড়ের মানুষের দুর্দশা মিটেছে। ইতোমধ্যে তার সুফল পাচ্ছেন জেলার ৫০টি গ্রামের মানুষ। আগামীতে পানি সংকটে থাকা পার্বত্য তিন জেলার সব গ্রামেই সুপেয় পানি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।’

তিনি বলেন, ‘আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই বলে আসছি, অপ্রয়োজনীয় কোনো মেগা প্রকল্প নয়, অতীতের মতো কোনো লুটপাটের প্রকল্পের দিকে এই সরকার যাবে না। আমরা মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ, মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় উদ্যোগটি নিয়ে বাস্তবায়ন করব। সেজন্য আমি প্রতি সপ্তাহেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সশরীরে যাচ্ছি, মানুষের সাথে কথা বলে তাদের আসলেই কী ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন তা বের করছি। আগামীতেও স্থানীয়দের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য সকলের সহযোগিতা দরকার।’

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে বাসস-কে বলেন, ‘৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলার দুর্গম এলাকায় পুরোনো গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম মেরামতের পাশাপাশি নতুন জিএফএস, রিংওয়েল, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম, গভীর নলকূপ স্থাপন এবং পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরাসরি অন্তত ৫০টি পাড়ার মানুষ এখন সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন।’ তিনি জানান, টানা বৃষ্টি ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে কিছু স্থাপনার প্লাস্টার ও রঙের কাজ বাকি থাকলেও প্রকল্পের মূল কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। এক সময় পাহাড়ের চূড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে, কোথাও আবার প্রায় হাজার ফুট নিচে নেমে পানি সংগ্রহ করতে হতো গ্রামবাসীকে। পাহাড়ি ছড়া, ঝিরি ও ঝর্ণার ঘোলা, কাদাযুক্ত অনিরাপদ পানিই ছিল দুর্গম এলাকার মানুষের প্রধান ভরসা। বর্ষাকালে পাহাড়ি ছড়ায় পানি থাকলেও তা মাটি, কাদা ও ময়লায় ভরা। এতে পাহাড়ি নারী ও শিশুদের দিনের বড় একটি সময় পানি সংগ্রহেই ব্যয় করতে হতো। পানির জন্য প্রতিদিনের এই সংগ্রাম ছিল তাদের জীবনের এক নির্মম বাস্তবতা।
 
বছরের পর বছর ধরে চলা সেই দুর্ভোগের চিত্র এখন অনেকটা বদলে গেছে। সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গভীর নলকূপ স্থাপন গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস), রিংওয়েল ও রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্গম এলাকাতেও গড়ে তোলা হয়েছে পানি সরবরাহের টেকসই অবকাঠামো।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বান্দরবানের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সাইদুল ইসলাম বাসস-কে বলেন, ‘ইতোমধ্যে জেলার অন্তত ৫০টি পাড়ায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা এখন বাড়ির পাশেই বসানো পানির কল থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের’ আওতায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পাল্টে দিয়েছে আগের কষ্ট ও সংকটের চিত্র।’

বান্দরবান সদরের একটি গ্রামে পানি সংগ্রহ করতে আসা মাচিং মারমা বলেন, ‘আগে পাহাড়ের নিচে গিয়ে ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো। এখন সরকার এখানে পানির কল বসিয়েছে, এখান থেকে পানি নিয়ে যাই। পুরো পাড়ার নারীরা সবাই এই কল থেকে পানি নিতে আসে।’

একইভাবে উখ্যাই ম্যা মারমা বলেন,  ‘আগে পানির জন্য অনেক কষ্ট করতে হতো। এখন পুরো গ্রামের মানুষ এখান থেকে পানি নিতে পারছে। এজন্য সবাই অনেক খুশি।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুপেয় পানি সহজলভ্য হওয়ায় সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে নারীদের জীবনে। আগে দিনের মোট সময়ের একটি বড় অংশ ব্যয় হতো পানি সংগ্রহের পেছনে, এখন সেই সময় পরিবারের অন্যান্য কাজ, সন্তানদের দেখাশোনা ও আয়মূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা যাচ্ছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি সব ধরনের পরিবার পানির সুবিধা পাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বান্দরবান পৌর এলাকায় ইতোমধ্যে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৬৭টি হাউসহোল্ড টয়লেট, ৮৬৭ হাউসহোল্ড টয়লেট উন্নয়ন, ৫টি পাবলিক টয়লেট, ৮টি পাবলিক টয়লেট সংস্কার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি টয়লেটের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এলাকার মানুষ স্যানিটেশন সুবিধায় আরো একধাপ এগিয়ে যাবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বান্দরবানের স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প গ্রহণ করে। এর আওতায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলায় ১২টি গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম (জিএফএস) মেরামত, নতুন ১০টি জিএফএস নির্মাণ, ৫৮৩টি রিংওয়েল নির্মাণ, ১৪০টি রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপন, ৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন এবং পাড়াভিত্তিক পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৫০টি প্রোডাকশন টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়। এছাড়াও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে বিভিন্ন এলাকায় স্বাস্থ্যসম্মত ৩০টি শৌচাগারও নির্মাণ করা হয়েছে।