বাসস
  ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৩৪

পাটকেলঘাটায় নৌকা তৈরির কারখানায় ভাগ্য গড়েছেন দেড় শতাধিক মানুষ 

ছবি : বাসস

মো. আসাদুজ্জামান

সাতক্ষীরা, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওরে পানি বৃদ্ধির ফলে নৌকার চাহিদা বেড়ে যায়। বর্ষাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরির ধুম লেগে যায়। এরই ধারাবহিকতায় সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা মহসড়কের দুই ধারে গড়ে ওঠা নৌকা তৈরির কারখানায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। আর এতে কর্মসংস্থান হয়েছে শতাধিক মানুষের।

কেউ কাটছেন কাঠ, কেউ আবার নৌকার কাঠামো সেট করছেন, কেউবা মেশিন দিয়ে ফিনিশিংয়ের কাজ করছেন, কেউ কাঠ জোড়া দিচ্ছেন, আবার কেউ নৌকার গায়ে আলকাতরা লাগাচ্ছেন। কারো যেন দম ফেলার সময় নেই। যে যার কর্মযজ্ঞ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। আর এ চিত্র দেখা যায় জেলার পাটকেলঘাটা এলাকার সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের দুই ধারে। এখানে গড়ে ওঠা কারখানা থেকে প্রতিবছর দুই হাজারের অধিক নৌকা বিক্রি হয় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে। 

নৌকা তৈরির এসব কারিগরদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতায় ঋণ দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বিসিক সাতক্ষীরা।

জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীর উপচে পড়া পানি ও জলাবদ্ধতার কারণে সাতক্ষীরাসহ এর আশে পাশের বিস্তীর্ণ এলাকা বছরে প্রায় ৬ মাসের অধিক সময় জুড়ে জলমগ্ন থাকে। ফলে চলাফেরার জন্য দেশের দক্ষিণ এ জনপদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নৌকার ব্যবহার। আর তাই সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের পাটকেলঘাটার বলফিল্ড এলাকায় সড়কের দুই ধারে প্রায় দুই যুগ আগে থেকে গড়ে উঠেছে ২০টিরও বেশি নৌকা তৈরির কারখানা। 

এখানকার তৈরিকৃত নৌকা জেলার চাহিদা মিটিয়ে পাশ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায়ও সরবরাহ হচ্ছে। তাই দিন-রাত কর্মব্যস্ততায় কাটাচ্ছেন এখানকার কারখানার কারিগররা। প্রতিদিন নৌকা তৈরির কারখানাগুলোতে ভোর থেকে শুরু হয় কাঠ কাটা, পেরেক ঠোকা, দড়ি বাঁধা এবং আলকাতরা লাগানোর কাজ। আর এ শিল্পের সাথে জড়িত বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠী এর ওপর নির্ভর করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন। দিন-রাত কর্মব্যস্ততায় এখন মুখর এখানকার কারখানা এলাকা। 

ব্যবসায়ীরা জানান, কাঠ ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় মজুরিও বেড়েছে কারিগরদের। এতে নৌকা উৎপাদনের খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। এ জন্য কিছুটা বাড়তি দামেই নৌকা বিক্রি করতে হচ্ছে। 

সাধারণতঃ মেহগনি, চম্বল, খৈ ও ইপিলিপি কাঠ দিয়ে তৈরি হয় এসব নৌকা। তবে, ডিঙি, জেলে, টাবুরি ও খেয়া নৌকার চাহিদা বেশি। কারিগরদের মেধা আর শ্রমে মাত্র দু’তিন দিনেই তৈরি হয় একেকটি নৌকা। এরপর তা চলে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আর এসব নৌকার বদৌলতেই সারাদেশে বিশেষভাবে পরিচিত হচ্ছে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাট উপজেলা। 

দেড় শতাধিক সুদক্ষ কারিগর দৈনিক এসব কারখানায় তৈরি করছে ২০ থেকে ২৫টি নৌকা। ফলে এ শিল্পের সাথে জড়িত শতাধিক পরিবারের আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে এ নৌকা তৈরির কারখানাগুলোতে। সারাবছর নৌকা তৈরি হলেও বর্ষা মৌসুমে এর চাহিদা, কদর ও অর্ডারের চাপ বাড়ে কয়েক গুণ।

মেসার্স ঐশী নৌকা কারখানার মালিক আনোয়ার হোসেন বাসসকে বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে পাটকেলঘাটা বাজারে তিনি নৌকা তৈরি করছেন। আগে তার বাপ দাদারা এ বাজারে নৌকা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বংশপরস্পরায় এখন তিনিও এ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বর্তমানে তার কারখানায় ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন।

তিনি বলেন, এখন বর্ষার মৌসুম। তাই নৌকার চাহিদা বেশি থাকায় বেচা-কেনাও বেশি হচ্ছে। বর্তমানে নৌকা তৈরির মালামালের দাম ও শ্রমিকদের মজুরি বেশি হওয়ায় তাদের আশানুরূপ লাভ হচ্ছেনা বলে তিনি জানান। এখানে ডিঙি নৌকা, জেলেদের জাল ধরা নৌকা, সাগরে যারা মাছ ধরে তাদের জন্য বড় নৌকাসহ সব ধরনের নৌকাই তৈরি হয়। পাটকেলঘাটায় তৈরি নৌকা জেলার চাহিদা মিটিয়ে খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, নড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যায়।

আরেক কারখানা মালিক সাজ্জাদ হোসেন জানান, একটি নৌকার সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সাইজ অনুযায়ী কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তার কারখানায় ১০ জন শ্রমিক কাজ করেন। দিনে সর্বনিম্ন ৬০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ তাদের ৮০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়। এছাড়া কাঠ ও পেরেকসহ সব জিনিসের দাম বেশি হওয়ায় এখন একেকটি নৌকায় ২ থেকে তিন হাজার টাকা লাভে ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

নৌকা তৈরির কারিগর শিমুল হোসেন জানান, নৌকা তৈরিতে মূলত মেহগনি, খৈ ও চম্বল কাঠ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পেরেক, তারকাঁটা ও জলুয়া ব্যবহার করা হয়। ১২ হাত লম্বা খই কাঠের একটি নৌকা তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। যা বিক্রি হয় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা।

নৌকা শ্রমিক তুহিন জানান, নৌকা কারখানায় কাজ করে প্রতিদিন ৭০০ টাকা মজুরি পেয়ে থাকেন। তা দিয়ে তিনি তার পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোই আছেন।

সাতক্ষীরা বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাস বাসসকে বলেন, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করছেন। সাতক্ষীরায়ও বিভিন্ন ধরনের উদ্যোক্তা রয়েছে। সাতক্ষীরা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা। এ জেলায় যে নৌকা শিল্প রয়েছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। এখানে বিভিন্ন নদী, নালা ও মৎস্য ঘেরে মাছ ধরার জন্য নৌকা গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর এই নৌকা তৈরির জন্য সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটায় গড়ে উঠেছে অনেকগুলো কারখানা। 

তিনি বলেন, এখানকার কারখানায় তৈরি নৌকা জেলার চাহিদা মিটিয়ে আশে পাশের জেলায়ও সরবরাহ করছে। বিসিক এর পক্ষ থেকে ওই সমস্ত কারখানাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। কয়েকজনকে বিসিক এর নিবন্ধনে নেয়া হয়েছে। তারা সহযোগিতা চাইলে বিসিক থেকে তাদের আর্থিক সহযোগিতা করা যাবে। স্বল্প সুদে তাদের ঋণের সুবিধাসহ পণ্য বিপণনেও তাদের সহযোগিতা করা যেতে পারে বলে এ কর্মকর্তা জানান।